মে দিবসে ফ্রান্সে বিক্ষোভের জোয়ার, ছুটি বাতিল বিতর্কে রাজপথে লাখো মানুষ

এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন সমন্বয় করা। তিনি সরকারের কাছে ন্যূনতম মজুরি অন্তত পাঁচ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
১ মে সরকারি ছুটি ও কর্মবিরতি দিবস হিসেবে বজায় রাখার দাবিতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভ
১ মে সরকারি ছুটি ও কর্মবিরতি দিবস হিসেবে বজায় রাখার দাবিতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভ |নয়া দিগন্ত

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে ফ্রান্সে এবারের ১ মে পালিত হয়েছে ব্যাপক বিক্ষোভ ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার মানুষ দেশজুড়ে আয়োজিত বিভিন্ন মিছিলে অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে রাজধানী প্যারিসে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২৪ হাজার মানুষ।

তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি এবং প্যারিসে প্রায় এক লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন।

এবারের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ১ মে সরকারি ছুটি ও কর্মবিরতি দিবস হিসেবে বজায় রাখার দাবি। একইসাথে মজুরি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির প্রভাব ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতাও বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যে উঠে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্ঘাত পরিস্থিতিও শ্রমিকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং তা আন্দোলনের স্লোগানে প্রতিফলিত হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোঁরা নুনিয়েজ জানিয়েছেন, অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে দেশজুড়ে মোট ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে সাতজন প্যারিসে। পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কিছু জায়গায় উত্তেজনা দেখা গেছে।

সম্প্রতি ১ মে ছুটির দিনে বেকারি, ফুলের দোকানসহ কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সরকারি পরিকল্পনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ এই সিদ্ধান্তকে শ্রমিক দিবসের মূল চেতনার পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ ল্যকর্নু এ বিষয়ে প্রতীকীভাবে একটি বেকারি থেকে রুটি কিনে সমর্থন জানান, যা বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়ে এবং তা রাজনৈতিক প্রদর্শনী হিসেবে আখ্যায়িত হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ইস্যুতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ প্যারিসে এক সমাবেশে সামাজিক ন্যায়বিচার ও শ্রমিক অধিকারের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, তার দল আসন্ন ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। একইভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এই ইস্যুকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছে।

ডানপন্থী নেতা জর্দান বার্দেলা শ্রমিকদের জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজ গঠনের কথা বলেন এবং প্রস্তাব দেন যে, ১ মে কাজ করতে চাইলে তা স্বেচ্ছায় হওয়া উচিত এবং এর বিনিময়ে দ্বিগুণ মজুরি প্রদান করা যেতে পারে। তার এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক নেতা অলিভিয়ে ফোর বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে কিছু বিক্ষোভকারীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। তার উদ্দেশ্যে নানা স্লোগান দেয়া হয়, যা ফ্রান্সের বাম রাজনীতির ভেতরের বিভাজনকেও সামনে নিয়ে আসে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী সিজিটির প্রধান সোফি বিনে জোর দিয়ে বলেন, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন সমন্বয় করা। তিনি সরকারের কাছে ন্যূনতম মজুরি অন্তত পাঁচ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

ফ্রান্সের বাইরেও বিশ্বের ১৬৭টি দেশে মে দিবস পালিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা বৈষম্য, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান ও শ্রম অধিকার নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। ফলে এবারের মে দিবস শুধু একটি জাতীয় নয়; বরং বৈশ্বিক শ্রমিক সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্রান্সে শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক দাবিগুলো একসূত্রে গাঁথা হয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।