তারকাখচিত দশম ভিভাটেক : প্যারিসে প্রযুক্তির বিশ্বমেলা

রোলাঁ লেস্ক্যুর তার বক্তব্যে প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি দুই দিকই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানবসভ্যতা বর্তমানে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির কাঠামো বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন একটি বৈশ্বিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
প্যারিসে প্রযুক্তির উদ্ভাবনের বিশ্বমঞ্চ
প্যারিসে প্রযুক্তির উদ্ভাবনের বিশ্বমঞ্চ |নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুরু হয়েছে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ প্রদর্শনী ‘ভিভাটেক ২০২৬’।

বুধবার (১৭ জুন) প্যারিস এক্সপো পোর্ত দ্য ভার্সাই প্রাঙ্গণে উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আসর প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের শীর্ষ উদ্যোক্তা, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের একত্র করেছে।

১৭ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত চলমান এই প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার দর্শনার্থী, ১৪ হাজার স্টার্টআপ, ৪ হাজার অংশীদার প্রতিষ্ঠান এবং ৩ হাজার ৬০০ বিনিয়োগকারী। ১০ম বর্ষপূর্তির এই আয়োজন প্রযুক্তি অর্থনীতিতে ভিভাটেকের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উদ্বোধনী অধিবেশনে ভিভাটেকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পাবলিসিস গ্রুপের তত্ত্বাবধায়ক পরিষদের সভাপতি মরিস লেভি বলেন, গত এক দশকে প্রযুক্তি গবেষণাগারের সীমা অতিক্রম করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে।

তার মতে, ভিভাটেক এখন কেবল একটি আঞ্চলিক আয়োজন নয়, বরং একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির রূপরেখা নির্ধারিত হয়।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, এক দশক আগে যেসব প্রযুক্তি কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ সেগুলো বাস্তবে মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, উন্নত ডেটা সিস্টেম এবং মহাকাশ প্রযুক্তি এখন আর ভবিষ্যতের ধারণা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচিত অতিথি ছিলেন বিলাসপণ্য সাম্রাজ্য এলভিএমএইচ-এর প্রধান নির্বাহী বার্নার্ড আর্নো। তিনি ভিভাটেকের দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে এই আয়োজনের সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেন।

আর্নোর মতে, বড় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যের পেছনে মূল শক্তি হলো স্টার্টআপ সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনী চিন্তার ধারাবাহিকতা।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সমন্বয় ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দেবে। শুধু পণ্য নয়, বরং অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন এখন ব্যবসার কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

তিনি আরো বলেন, নতুন প্রযুক্তি বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স বিলাসপণ্য শিল্পকেও দ্রুত পরিবর্তন করছে।

এবারের ভিভাটেকে জার্মানিকে অতিথি দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ইউরোপীয় প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। উদ্বোধনী মঞ্চে ফ্রান্সের অর্থনীতি ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ববিষয়ক মন্ত্রী রোলাঁ লেস্ক্যুর এবং জার্মানির ডিজিটাল ও রাষ্ট্র আধুনিকায়নবিষয়ক মন্ত্রী কারস্টেন ভিল্ডবার্গার যৌথভাবে বক্তব্য দেন।

কারস্টেন ভিল্ডবার্গার বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় ইউরোপকে আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে হবে।

তার মতে, ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ নেতৃত্ব ইউরোপকে নতুন প্রযুক্তিগত শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

রোলাঁ লেস্ক্যুর তার বক্তব্যে প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি দুই দিকই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানবসভ্যতা বর্তমানে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির কাঠামো বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন একটি বৈশ্বিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং নৈতিকতার বিষয়গুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউরোপের কাছে প্রয়োজনীয় মেধা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকলেও অবকাঠামো, গবেষণা ও বিনিয়োগে আরো বড় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে তিনি মত দেন।

উদ্বোধনী দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের উপস্থিতি। তিনি তার বক্তব্যে অ্যামাজনের ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং তার মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন।

এক সাবেক মহাকাশচারীর সাথে আলোচনায় তিনি বলেন, মানবজাতির পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক সীমান্ত হবে মহাকাশ।

তার মতে, ইন্টারনেট যেমন এক সময় বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছিল, তেমনি মহাকাশ অর্থনীতি আগামী দশকগুলোতে নতুন শিল্প বিপ্লবের জন্ম দেবে।

বেজোস আরো বলেন, ব্লু অরিজিনের লক্ষ্য শুধু মহাকাশ ভ্রমণ নয়, বরং এমন একটি অবকাঠামো তৈরি করা, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে হাজার হাজার উদ্যোক্তা মহাকাশভিত্তিক নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন।

তার দৃষ্টিতে, মহাকাশ হবে মানবজাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা ও সম্প্রসারণের নতুন ক্ষেত্র।

ভিভাটেক ২০২৬-এর উদ্বোধনী আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, সবুজ উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব আগামী দশকের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

১০ম বর্ষপূর্তির এই আসর শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনী নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি বিশ্বের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্যারিসের এই আয়োজন আবারো প্রমাণ করেছে, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত দূরদৃষ্টি মিলেই গড়ে উঠবে আগামী দিনের বিশ্ব।