মাদারীপুর শহরের একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে মা-বাবা ও ছয় মাসের শিশুসন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রেমের সম্পর্কের জেরে মুসলিম ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্ম মতে চিন্ময় শিকদারকে বিয়ে করেছিলেন ইসরাত জাহান সাউদা। ভালোবাসার সেই সংসার শেষ পর্যন্ত থেমে গেল তিনটি লাশ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।
মঙ্গলবার দুপুরে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিহা রফিক ভাবনা জানান, শহরের আমিরাবাদ এলাকার মৃত বীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী সান্তনা রানী চন্দের বাসায় সাড়ে তিন বছর ধরে ভাড়া থাকতেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব কলাগাছিয়া এলাকার যতিন শিকদারের স্ত্রী মিষ্টি বাড়ৈ।
রোববার বিকেলে যতিনের প্রথম স্ত্রীর ছেলে চিন্ময় শিকদার তার স্ত্রী ইসরাত জাহান সাউদা ও ছয় মাসের কন্যাসন্তানকে নিয়ে ঢাকা থেকে মাদারীপুরে আসেন। পরে তারা মিষ্টি বাড়ৈয়ের বাসায় ওঠেন।
পুলিশ জানায়, রাতে খাবার খাওয়ার পর চিন্ময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি কক্ষে অবস্থান নেন এবং দরজা বন্ধ করে দেন। গভীর রাত পর্যন্ত কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে মিষ্টি বাড়ৈ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে ভোরে মা-বাবা ও শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা। পরে লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ঢাকার উত্তরায় একটি স্কুলে পড়ালেখার সময় নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা গ্রামের এরশাদ মিয়ার মেয়ে ইসরাত জাহান সাউদার সাথে চিন্ময় শিকদারের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পরিবারের অমত উপেক্ষা করে ইসরাত মুসলিম ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু ধর্ম মতে চিন্ময়কে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তার নাম রাখা হয় ইশা। শুরুতে সুখের সংসার হলেও কিছুদিনের মধ্যেই নেমে আসে অভাব-অনটন ও দুশ্চিন্তা।
চিন্ময় শিকদারের চাচী জানান, ঢাকায় থাকা অবস্থায় তাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে দুই পরিবার বিষয়টি মেনে নিলেও ইশার বাবা-মা মাদারীপুরে খুব একটা আসতেন না, মোবাইল ফোনেই যোগাযোগ রাখতেন। কয়েকদিন আগে ইশা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হতো। সব মিলিয়ে চিকিৎসার পেছনে প্রায় ১২ থেকে ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সংসারের চাপ, ঋণের বোঝা ও মানসিক হতাশা থেকে প্রথমে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন চিন্ময়। পরে ছয় মাসের শিশুকন্যাকে নিয়ে ফ্যানের সাথে রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারিহা রফিক ভাবনা বলেন, ‘ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে।’
এদিকে মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ইশা দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। তার চিকিৎসার পেছনে প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করেন চিন্ময়। এতে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ধারণা করা হচ্ছে, এই হতাশা থেকেই স্ত্রীকে হত্যা করে নিজেও সন্তানসহ আত্মহত্যা করেন।’



