বাংলাদেশীদের জন্য পাকিস্তানে উচ্চ শিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে। রোববার (১৭ মে) ও সোমবার (১৮ মে) শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) অনুষ্ঠিত দু’ দিনের বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিতীয় এডুকেশন এক্সপোতে শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় সাড়া মিলেছে।
উচ্চ মাধ্যমিকের পরেই স্নাতকে স্কলারশিপ হাতছাড়া করতে চান না সিলেটের শিক্ষার্থীরা। তাই শিক্ষামেলায় এইচএসসি উত্তীর্ণদের সাড়াই বেশি ছিল। তবে শুধু স্নাতক নয়, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতেও ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ দিচ্ছে পাকিস্তান।
সোমবার সন্ধ্যায় শেষ হয়েছে দু’ দিনের এই আন্তর্জাতিক এক্সপো। পাকিস্তানের এমন উদ্যাগ বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণ বলছেন শিক্ষার্থীরা।
তারা বলছেন, অতীতে একটি দল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্ররোচনায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক কুক্ষিগত করে রেখেছিল। অথচ ওই রাষ্ট্র সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু বললেও উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেছে, এমন উদাহরণ নেই।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান নলেজ করিডোরের আওতায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিতীয় শিক্ষামেলা রোববার ও সোমবার দিনব্যাপী শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাকিস্তানে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশী তরুণ শিক্ষার্থীদের বেশ সাড়া মেলে। মেলায় পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও স্কলারশিপ বিষয়ে নানা তথ্য জানেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোরের আওতায় প্রথম ধাপে গেল বছরের অক্টোবরে ৭৪ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে পাকিস্তানে উচ্চ শিক্ষার জন্য গেছেন।
যেখানে বৃত্তির জন্য আবেদন করেছিলেন ৬০০ শিক্ষার্থী। যাচাই-বাছাই শেষে ৭৪ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয় পাকিস্তান। বৃত্তির আওতায় অধ্যয়ন, থাকা খাওয়া ও বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার সম্পূর্ণ খরচ বহন করবে পাকিস্তান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শাবিপ্রবির এই মেলায় স্টল দিয়েছে পাকিস্তানের ২২টি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়।
মেলায় অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে— বাহরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামাবাদ, পাক-অস্ট্রিয়া ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন করাচি, ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচার ফয়সালাবাদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব কম্পিউটার অ্যান্ড ইমার্জিং সায়েন্স, ইকরা ইউনিভার্সিটি করাচি, এনইডি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি করাচি, ডিও ডব্লিউ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ ইসলামাবাদ, ইউনিভার্সিটি অব পেশওয়ার, ইউনিভার্সিটি অব লাহোর, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কমস্যাটস ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ, লিয়াকত ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল অ্যান্ড হেলথ সায়েন্স, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ইন্জিনিয়ারিং অ্যান্ড এপ্লাইড সায়েন্সস, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি ইসলামাবাদ, ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সস ও লুমস ইউনিভার্সিটি।
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে ভিড় জমান স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা।
ইকরা ইউনিভার্সিটি করাচির এক্সিকিউটিভ মোহাম্মদ হামজা বলেন, ‘এই স্কলারশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ভ্রাতৃত্ববোধ আরো সুদৃঢ় হোক। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের জনগণের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত।’
পাকিস্তানে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থী মারিয়া সুলতানা বলেন, ‘স্নাতকোত্তরের জন্য আবেদন করব। সুযোগ পেলে পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় মাস্টার্স করতে চাই।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিতীয় এডুকেশন এক্সপো রোববার বেলা সোয়া ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউ সোশ্যাল সায়েন্স ভবনে ফিতা কেটে যৌথভাবে উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও শাবিপ্রবির ভিসি অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো: সাজেদুল করিম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ইসমাইল হোসেন ও পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।
শাবিপ্রবির সাথে মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার বলেন, ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। দু’ দেশের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যম দু’ দেশই উপকৃত হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাকিস্তানের কয়েকটি প্রদেশের সাথে সিলেটের বেশ মিল রয়েছে। সিলেটের সাথে পাকিস্তানের বন্ধন আরো দৃঢ় হবে বলে বিশ্বাস করি। সিলেটের শিক্ষার্থীরা পাকিস্তানে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ নিতে পারে।’
হাই কমিশনার আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান নলেজ করিডোরের আওতায় পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৫০০ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীকে ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ দেয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রথম এই যাত্রা শুরু হয়। তখন ৬০০ শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই করে ৭৪ জনকে স্কলারশিপ দেয়া হয়। ইতোমধ্যে তারা পাকিস্তানে অধ্যয়ন করছেন।’
শাবিপ্রবির ভিসি অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ। আমার পরিবারের তিন প্রজন্মের তিন দেশে জন্ম। সুতরাং এই তিন দেশেরই সংস্কৃতি ও জীবনমানের বেশ মিল রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়য়গুলোর সাথে গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময় করতে আগ্রহী শাবিপ্রবি।’ তিনি পাকিস্তানকে বন্ধুত্বের এ ধারা অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ ছলিম মো: আব্দুল কাদির, পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক আফম জাকারিয়া, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতরের পরিচালক আহমদ মাহবুব ফেরদৌসি, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ফয়ছল আহমদ প্রমুখ।



