মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ‘উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন ও খরা-সহিষ্ণু নেপিয়ার ঘাসের ব্যবহার বাড়লে আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে অর্গানিক মিল্ক বাজারজাত ও অর্গানিক গোশত রফতানি সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কম খরচে নিরাপদ ও পুষ্টিকর দুধ ও গোশত উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত ‘অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ রিসার্চ শোকেস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ও অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে নিরাপদ খাদ্য ও নিউট্রিশনাল ফুডের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জেনেটিক পরিবর্তিত খাদ্যের পরিবর্তে প্রাকৃতিক ও উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। নেপিয়ার ঘাসের মতো উন্নত প্রাণিখাদ্য সেই চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘গবেষণার মাধ্যমে এমন নেপিয়ার ঘাস উদ্ভাবন করা হয়েছে যাতে ১৭-১৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রোটিন রয়েছে। সাধারণ ঘাসের তুলনায় এর পুষ্টিমান অনেক বেশি। এ ঘাস খরা-সহিষ্ণু হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলাতেও সহায়ক হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নেপিয়ার ঘাসভিত্তিক আধুনিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার ফলে গবাদিপশুর দুধ উৎপাদন বাড়ছে এবং উৎপাদন ব্যয় কমছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে অর্গানিক মিল্ক বাজারজাত করা সম্ভব হবে। একইসাথে প্রাকৃতিক খাদ্যে উৎপাদিত অর্গানিক গোশত বিদেশে রফতানির সুযোগও তৈরি হবে।’
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ ও খরা-সহিষ্ণু ঘাস উদ্ভাবন প্রাণিসম্পদ খাতে যুগান্তকারী অগ্রগতি। এতে কম খরচে উন্নতমানের প্রাণিখাদ্য নিশ্চিত হবে। ফলে গোশত উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং ভোক্তারাও তুলনামূলক সহনীয় দামে মাংস কিনতে পারবেন।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মাধ্যমে কম খরচে উন্নতমানের ঘাস ও প্রাণিখাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন চিন্তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করারও আহ্বান জানান।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘দেশে ঘাস উৎপাদনে ইতোমধ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। ভবিষ্যতে আধুনিক ও নিরাপদ প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তুলতে সরকার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।’
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: শাহজামান খান বলেন, ‘নেপিয়ার ঘাস ও সাইলেজ উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে রফতানিমুখী প্রাণিসম্পদ খাতে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জোনভিত্তিক রোগমুক্ত অঞ্চল গড়ে তুলতে পারলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রফতানিও সম্ভব হবে।’
বিএলআরআই’র মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (গবেষণা) ড. মো: জিল্লুর রহমান। এছাড়া বক্তব্য দেন চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও গুলবালি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ড. ক্যামেরন ক্লার্ক।
‘অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ কৃষি অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকি। জুম প্ল্যাটফর্মে বক্তব্য দেন অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চের রিসার্চ ডিরেক্টর ড. স্টিফেন ক্রিম্প।
সেমিনারে ‘এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল লো-কস্ট বিফ প্রোডাকশন-প্র্যাকটিক্যাল সলুশনস অ্যান্ড পার্টনারশিপ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএলআরআই’র ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প সমন্বয়কারী ড. মোহাম্মদ খায়রুল বাশার। প্রবন্ধে প্রাণিসম্পদ খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস ও মিথেন নিঃসরণ কমাতে উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ ঘাস উৎপাদন বৃদ্ধি, বায়োগ্যাস প্রযুক্তি ও কার্বন ব্যালেন্সিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
‘ফিড ফার্স্ট সিস্টেমস : রিডিউসিং ফিড কস্ট থ্রু দি ম্যানেজমেন্ট অব নেপিয়ার গ্রাস’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো ড. রফিকুল ইসলাম ও ড. ক্যামেরন ক্লার্ক।
ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৮ সালে শুরু হওয়া এ গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ ঘাসে যেখানে প্রায় ৭ শতাংশ প্রোটিন থাকে, সেখানে নেপিয়ার ঘাসে প্রায় ১৭ শতাংশ প্রোটিন পাওয়া যাচ্ছে। উন্নত ব্যবস্থাপনায় কম খরচে বেশি দুধ উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে।’
সেমিনারে অংশ নেয়া সিরাজগঞ্জের খামারি মো: মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আগে দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভরতা বেশি ছিল। নেপিয়ার ঘাস ব্যবহারের পর কম দানাদার খাদ্যেই গাভীর দুধ পাঁচ-ছয় লিটার পর্যন্ত বেড়েছে। একইসাথে প্রতি শতাংশ জমিতে ঘাস উৎপাদনও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও দুধের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় খামারিরা এখনো সঙ্কটে রয়েছেন।’
রাজশাহীর নারী খামারি আমিনা আফরোজ জানান, ২০১৭ সালে দু’টি গাভী দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে তার খামারে ৭০-৮০টি গাভী রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে ওয়ান হেলথ গবেষণা, ক্ষুদ্র খামারিদের খাদ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও টেকসই প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় টেকসই ও স্বল্প ব্যয়ী প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।



