ইন্ডোচাইনিজ রোলার (Coracias affinis), যা স্থানীয়ভাবে ‘নীলকণ্ঠ পাখি’ বা বার্মিজ রোলার নামে পরিচিত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দৃষ্টিনন্দন আবাসিক পাখি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ পাখিকে থোড়মোচা, কেওয়া, নীলাচল, নীলাঘুঘু ও নীলকবুতর নামেও ডাকা হয়।
জানা যায়, এই পাখির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর উজ্জ্বল নীল রঙ। দেহের বিভিন্ন অংশে গাঢ় ও হালকা নীলের সংমিশ্রণ দেখা যায়। ডানায় বেগুনি এবং বাদামি আভা থাকায় উড়ন্ত অবস্থায় পাখিটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সাধারণত এদের দৈর্ঘ্য ২৬ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১৬০ থেকে ১৭৫ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।
নীলকণ্ঠ পাখি সাধারণত গাছের উঁচু ডাল বা বৈদ্যুতিক তারে বসে শিকারের জন্য অপেক্ষা করে। শিকার দেখামাত্র দ্রুত নিচে নেমে তা ধরে ফেলে। এদের প্রধান খাদ্য ঘাসফড়িং, পোকামাকড়, ছোট ব্যাঙ ও টিকটিকি।
প্রজনন মৌসুমে এরা মরা খেজুর, তাল বা নারিকেল গাছের ফোকরে বাসা তৈরী করতে অভ্যস্ত থাকলেও বর্তমানে এসব গাছ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন চা বাগানের ছায়াবৃক্ষের ফোকরে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় পাখি মিলে বাসা নির্মান করে। সাধারণত বছরে একবার তিন থেকে চারটি ডিম পাড়ে এবং ১৭ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। প্রজনন মৌসুম বসন্ত ও বর্ষাকালে হয়ে থাকে।
একসময় বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গ্রামাঞ্চলে প্রচুর নীলকন্ঠ পাখি দেখা গেলেও বর্তমানে এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এদের খাদ্যসংস্থান এবং গাছপালা কমে যাওয়ায় আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে।
নীলকন্ঠ পাখি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতভাবে দেখা গেলেও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পূর্ব ভারত, পাকিস্থান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামে, এবং বাংলাদেশে এদের উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া মধ্যপাচ্যের সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতেও এ পাখির দেখা মেলে। বাংলাদেশে সাধারণত খোলা মাঠ, কৃষিজমি ও গ্রামীণ পরিবেশে এদের বেশি দেখা যায়।
পরিবেশকর্মী ও বার্ড ফটোগ্রাফার খোকন থৌনাওজাম নয়া দিগন্তকে জানান, গত শুক্রবার শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানে শিকার ধরে বাচ্ছাদের জন্য বাসার দিকে উড়ে যাওয়ার সময় তিনি দৃষ্টিনন্দন এ পাখিটির স্থিরচিত্র ধারণ করেন। এসময় ছবির কবি খ্যাত পরিবেশকর্মী ও সৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান তার সাথে ছিলেন। তিনিও চা বাগানের নীল আকাশের দূত নীলকন্ঠ পাখির স্থিরচিত্র ধারণ করেন।
তিনি বলেন, ‘চা বাগানের সেড ট্রি বা ছায়াবৃক্ষের ফোকরে নীলকন্ঠ পাখি বাসা তৈরী করে এবং ডিম পাড়ে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এ ধরনের পাখির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আবাসস্থল ধ্বংস ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এ পাখিসহ অনেক আবাসিক প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে।’
দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় বর্তমানে এই পাখিটি শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা বাগানে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
খোকন থৌনাওজাম আরো জানান, ভারতে এ পাখিকে ‘নীলকান্ত’ নামে ডাকা হয়। জমিদারী আমলে তৎকালীন জমিদাররা দূর্গাপুজার আগে নীলকণ্ঠ পাখি সংগ্রহ করে পুজার শুরুতে অবমুক্ত করার একটি প্রথা ছিল। এছাড়া হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে এ পাখিকে পবিত্র ও শুভ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর সময় নীলকন্ঠ পাখি দেখা শুভ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
এদিকে তারিক হাসানের ক্যামেরায় চিত্রধারণ করা একটি ছবি তিনি তার ফেসবুকে টাইমলাইনে পোস্ট করে লিখেন, ‘আমার বৌর বেহেশতি পাখি।’ তার এই পোস্টে রিয়েক্ট এবং মন্তব্য করেন কয়েক’শ মানুষ। মো: চঞ্চল নামের একজন মন্তব্যের কলামে লিখেন ‘ভাই- দার্শনিক হলে ক্যাপশনটা কেমন হতো ? কামরুজ্জামান খানের মন্তব্য ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার সৃষ্টি কতই না সুন্দর, মাশাআল্লাহ।’
তানজিনা চৌধুরী লিখেন ‘আল্লাহর কি সুন্দর সুন্দর সৃষ্টি’। মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া মন্তব্য করেন, ‘সুবহানাল্লাহ, চোখের শান্তি।’ জুনায়েদ আহমেদ জুনেদ লেখেন, ‘সুবাহানাল্লাহ, চোখ ফেরানো যায়না! কী অপূর্ব।’ এভাবে অসংখ্য মানুষ নীলকন্ঠ পাখি পোস্ট করা ছবিতে মন্তব্য করেন।
এব্যাপারে প্রকৃতির এই সুন্দর পাখিটি সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মী এবং সৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান।



