রংপুরে চাঞ্চল্যকার ডিসির সই জাল করে ৩৯০টি ভুয়া অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানকারী সাবেক অফিস সহকারী
কাম-কম্পিউটার অপারেটর শামসুল ইসলাম ও তার স্ত্রী মায়া ইসলামের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে রংপুর স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো: বদরুল আলম ভূঞা এই আদেশ দেন। পরে তাদের কড়া নিরাপত্তায় রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
রংপুর জজ কোর্ট পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম জানান, ২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাদের বিরুদ্ধে ডিসির সই জাল করে ভুয়া অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়ার অভিযোগে মামলা করেন রংপুর ডিসি অফিসের তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমূ্ল্য চন্দ্র রায়। মামলায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ৩৯০টি বন্দুক ও একনলা বন্দুকের ভুয়া লাইসেন্স দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীকালে ভুয়া লাইসেন্স গ্রহণকারী ২৭০ জন সাবেক পুলিশ, নৌ, সেনা সদস্যসহ ৩৯১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয়।
এছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের লাইসেন্সের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের মামলায় গত ৩১ মার্চ স্পেশাল জজ শামসুল ও তার স্ত্রীকে চার বছরের সশ্রম কারাদন্ডাদেশ দেয়। এ সময় তারা পলাতাক ছিলেন।
এদিকে গতকাল আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। অস্ত্র আইনের মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় এর তদন্তের দায়িত্ব আসে দুদকের ওপর। দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির তদন্ত করেন দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আতিকুর রহমান। তদন্ত তদারক করেন উপ-পরিচালক মোজাহার আলী সরদার।
দুদক বলছে, প্রধান আসামি শামসুল ২০১১ সালের ১৭ মে থেকে ২০১৭ সালের ১৬ মে পর্যন্ত ডিসির কার্যালয়ের কার্যালয়ের জুডিশিয়াল মুনশিখানা (জেএম) শাখায় অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তার দায়িত্ব ছিল লাইসেন্স শাখায়। তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের ভলিউম নিজ হেফাজতে সংরক্ষণ করতেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর লাইসেন্স প্রত্যাশীদের করা আবেদন গ্রহণ করে নোটশিটের মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনারের কাছে উপস্থাপন, পুলিশ প্রতিবেদন গ্রহণ, প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার অনুমোদিত হলে ফরমে এবং ভলিউমের পাতায় প্রয়োজনীয় তথ্যসহ প্রস্তুত করে জেএম শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর করে ভলিউমের পাতায় প্রাপ্তি স্বীকার করে লাইসেন্স প্রদান এবং নবায়ন করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি।
ওই দায়িত্ব পালনকালে শামসুল অবৈধভাবে আর্থিক লাভবান হয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ২১টি ভলিউমের ৩৯০টি লাইসেন্সের পুরোনো পাতা ছিঁড়ে নতুন পাতা সংযোজন করেন। জালিয়াতি করে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আরেক অফিস সহকারী অনুকূল চন্দ্রের স্বাক্ষর জাল করে ৩৯০ জন ব্যক্তির নামে ভুয়া বা জাল লাইসেন্স ইস্যু করেন তিনি।
ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার পর শামসুল ইসলাম ২০১৭ সালের ১৬ মে থেকে অফিসে যাওয়া বন্ধ করে গা ঢাকা দেন। ২০১৭ সালের ১৭ মে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান অভিযুক্ত ওই কর্মচারীর কক্ষের আলমারির তালা ভাঙেন। এতে ওই আলমারিতে নগদ ৭ লাখ ১০০ টাকা, শামসুলের নিজের নামে ১১ লাখ (একটি পাঁচ লাখ ও অন্যটি ছয় লাখ) টাকার দু’টি এফডিআর এবং দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পাওয়া যায়। সেইসাথে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ইস্যুকৃত অবৈধ লাইসেন্স জব্দ করা হয়।
তদন্তকালে দুদকের কর্মকর্তা ৩৫৭টি লাইসেন্স, ৩৫৪টি অস্ত্র এবং ৪ হাজার ৩৮টি কার্তুজ জব্দ করেন। শামসুল ইসলাম অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। জেলা প্রশাসকের চোখ ফাঁকি দিয়ে তার সই জাল করেছে ওই প্রতারক চক্র। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে চক্রটি গোপনে দেশের বিভিন্ন স্থানের ৩৮৯ জনকে আগ্নেয়াস্ত্রের জাল লাইসেন্স দিয়েছে। বেআইনিভাবে দেয়া এসব ভুয়া লাইসেন্সের আবেদনপত্রে সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর সনদ, পুলিশ ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। একেকটি লাইসেন্স দিতে চক্রটি নিয়েছে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
ডিসি অফিস সূত্র জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, সার্জেন্ট, করপোরালসহ অন্যান্য পদের ব্যক্তিদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া ২০১২ সাল থেকে বন্ধ আছে। তাই কৌশলে ১৯৮৬ থেকে ২০০৯ সাল উল্লেখ করে লাইসেন্সগুলো দেয়া হয়েছে মূলত ২০১৪ সাল ও ২০১৭ সময়কালে। চাকরি করার সময় সেনা, পুলিশসহ সব বাহিনীর প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স গ্রহণ করতে পারেন।
ওই সময় তাদের অধস্তনদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নেয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। এ কারণে অবসরে যাওয়ার পর অবৈধভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স নেয়ার ওই পথ বেছে নিয়েছিলেন তারা।
এই ঘটনায় ২০১৭ সালের মে মাসে কোতোয়ালি থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক মামুনুর রশীদ অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করেন। মামলার পর র্যাব-১৩-এর সদস্যরা ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শামসুলকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করেন। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন শামসুল। ২৮১ জনকে আসামি করে ২০১৮ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন কোতোয়ালি থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মোখতারুল আলম।



