নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভরশো ইউনিয়নে চলছে শোকের মাতম। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে দিশেহারা ১০টি পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের সাথে ঈদ আনন্দে যোগ দিতে কর্মস্থল নোয়াখালী থেকে বাড়ি ফিরছিলেন একই এলাকার ৯ বন্ধুসহ ১০ জন। বাসভাড়া ১৮০০ টাকা বেশি হওয়ায় উঠেছিলেন ট্রাকে। কিন্তু খরচ বাঁচাতে গিয়ে ট্রাকে করে তাদের যাত্রা যে জীবনের শেষযাত্রা হবে, তা কে জানত!
সোমবার (২৫ মে) ভোরে টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পূর্বপাড়ে এক ভয়াবহ ট্রাক দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে ১৫টি তাজা প্রাণ। তাদের মধ্যে রয়েছেন নওগাঁর মান্দার উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের সেই ৯ বন্ধু। আর একজনের বাড়ি নিয়মতপরে উপজেলার মালঞ্চি গ্রামে।
মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনায় মান্দা উপজেলার এই ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা একটি রডবোঝাই ট্রাক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যমুনা সেতুর পূর্ব দিকে পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারায়। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকটি উল্টে গিয়ে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মিলিয়ে মোট ১৫ জন নিহত এবং ১০ জন গুরুতর আহত হন।
নিহতদের মধ্যে মো: সুলতান হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ তারেক, মো: আব্দুর রশিদের ছেলে মো: আব্দুল বারেক, মো: আব্দুর রহিমের ছেলে মোহাম্মদ বাদশা, একাব্বর হোসেনের ছেলে মো: সোহাগ হোসেন, মো: শহিদুলের ছেলে মোহাম্মদ রবিউল ও মোহাম্মদ সাকিমের ছেলে মোহাম্মদ সাগর রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
এছাড়া মুর্শিদপুর গ্রামের মৃত জাফর আলীর ছেলে মোহাম্মদ মইনুর ইসলাম এবং পাকুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ মাইনুল ও মোহাম্মদ গিয়াসও এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের ফিরোজ হোসেন জানান, উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে এই এলাকার শতাধিক যুবক বছরজুড়ে হরেক পণ্যের ব্যবসা করেন। ঈদের সময় বাসে চড়ে বাড়ি ফিরতে জনপ্রতি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা গুনতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে অনেকেই পণ্যবাহী ট্রাকে যাতায়াত করেন। নিহতরাও একইভাবে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন।
নিহত তারেকের বাবা সুলতান হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তারা নোয়াখালী এলাকায় ফেরি করে মানুষের চুল কেনা ও ছোট ছোট প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রি করতো। ঈদের ছুটিতে বন্ধুবান্ধব মিলে সবাই একসাথে বাড়ি ফিরছিলেন। বাসে ১৮০০ টাকা ভাড়া বেশি চাচ্ছিল, তাই একটু টাকা বাঁচাতে সবাই মিলে ট্রাকে উঠেছিল।
তিনি আরো জানান, ফেনী থেকে তারা ট্রাকে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু এই সামান্য টাকার জন্য তাদের সব শেষ হয়ে গেল।
হঠাৎ দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা খাতুন। একমাত্র মেয়ে রাহী মনিকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে স্বজনেরাও নিজেদের কান্না থামাতে পারছেন না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাবিনা খাতুন বলেন, ‘বাড়ি ফেরার পথে স্বামীর সাথে কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদি কেনার কথাও বলেছিল। রাত ১০টার দিকে শেষ কথা হয়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই।’
একই ইউনিয়নের ৯ যুবকসহ ১০ জনের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে ভারশোঁ ইউনিয়নসহ পুরো মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় কান্নার রোল পড়েছে। নিহতদের পরিবারে চলছে চরম আহাজারি। উপার্জনক্ষম সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা বাবা-মা ও স্বজনেরা।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকতার জাহান সাথী মোবাইল ফোনে জানান, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সাথে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরিফা হকের কথা হয়েছে। নওগাঁর লাশগুলো টাঙ্গাইল থেকে নওগাঁ নিয়ে আসার জন্য নওগাঁ জেলা প্রশাসন, মান্দা উপজেলা প্রশাসন এবং টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন যৌথ উদ্যেগ নিয়েছে। তারা সরকারি খরচে এই লাশগুলো নিয়ে আসা ও দাফনসহ সার্বিক বিষয়ে প্রশাসন সহযোগিতা করছেন। এছাড়া, নিহতদের পরিবারকে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার করা হচ্ছে।
ইউএনও বলেন, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে লাশগুলো টাঙ্গাইল থেকে নওগাঁ আসতে আসতে মধ্যরাত হয়ে যেতে পারে। নিহতদের পরিবার ও গ্রামবাসীর সাথে আলোচনা করে জানাজা ও দাফনের সময় নির্ধারণ করা হবে।
মান্দা উপজেলার সবগুলো লাশের একসাথে জানাজা পড়ানোর উদ্যেগ নেয়া হয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
সূত্র : ইউএনবি



