তীব্র গ্যাস সঙ্কটের কারণে দেশের সবকটি সার কারখানা বন্ধ এবং ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় কৃষি খাতে ভয়াবহ সঙ্কটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে আগামী আমন মৌসুমে দেশে সার সরবরাহ নিয়ে বড় ধরণের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দেশের ছয়টি কারখানায় সার উৎপাদন ও আমদানি বন্ধ থাকার এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। যা আগামী বোরো মৌসুমেও সঙ্কট তৈরি হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম আরো বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। এরই মধ্যে সার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় কৃষি উৎপাদন নিয়ে সঙ্কটে পড়েছে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ।
যদিও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকায় এই মুহূর্তে সঙ্কটের কোনো শঙ্কা নেই। আমদানিকৃত সার এখনো যতটা মজুদ আমাদের কাছে আছে, তাতে আরো মোটামুটি এক বছর চালিয়ে নেয়া যাবে।
তবে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি কিংবা সারের সঙ্কট তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে পাঁচটি ইউরিয়া কারখানা আছে। এগুলো হলো— ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার, যমুনা ফার্টিলাইজার ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি। এছাড়া বেসরকারিভাবে পরিচালিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডও (কাফকো) গ্যাস সঙ্কটে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। ফলে সরকারি-বেসরকারি সবগুলো সার কারখানার উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তথ্য বলছে, সরকারি পাঁচটি কারখানার দৈনিক মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় সাত হাজার ১০০ টন। দেশের সরকারি পাঁচটি ও বেসরকারি একটি কারখানায় বছরে ১০ লাখ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হয়।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। মোট চাহিদার প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টনই লাগে ইউরিয়া সার। যার কেবল ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদন হয়। যদিও কৃষিতে প্রয়োজনীয় সারের বড় অংশই আমদানি করতে হয়।
তবে স্থানীয় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সারের আমদানি ও চাহিদা পূরণ নিয়ে বাংলাদেশকে বড় শঙ্কায় ফেলেছে। এই পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন সঙ্কটে পড়ে কি-না এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও সারের সরবরাহ নিয়ে গোটা বিশ্বের মতো চিন্তায় বাংলাদেশের কৃষকরাও।
চাহিদা মতো জ্বালানি তেল না পেয়ে বোরো মৌসুমে সেচ নিয়ে অনেক কৃষক যেমন সমস্যায় পড়েছেন, তেমনি আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য সারের সরবরাহ নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। মূলত সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ।
এছাড়া দেশের কারখানাগুলোতে যে সার উৎপাদন হয় সেখানেও বড় ভরসা আমদানিকৃত গ্যাস। কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরিয়া চার লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি পাঁচ লাখ নয় হাজার টন ও এমওপি মজুদ রয়েছে তিন লাখ ৪২ হাজার টন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশেও লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক আমদানি করা সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এখানে কৃষি খাত জিডিপিতে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ অবদান রাখে। কৃষি খাতের জন্য বাংলাদেশকে আমদানি করা সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ সঙ্কট ও দামের ওঠা-নামার কারণে কৃষকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের আমদানি করা সারের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
এদিকে দেশের সব সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় আগামী আমন মৌসুমে সার যোগান নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। দেশের প্রায় ২০ শতাংশ সারের চাহিদা পূরণ করে স্থানীয় সারকারখানাগুলো। তবে এবার ইরান যুদ্ধের কারণে সার আমদানি সীমিত ও স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, এখন বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে। ফলে আগামী কয়েক মাস নতুন করে বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন পড়বে না।
তিনি বলেন, গ্যাস সঙ্কটের কারণে সরকারি পাঁচটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই পাঁচ কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে কোনো একটা সঙ্কট তৈরি হওয়ার আগেই একটা কৃত্রিম সঙ্কট আমরা তৈরি করে ফেলি, এটা মূল সমস্যা। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ভর্তুকি মূল্যে সার ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে থাকে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। টনপ্রতি যে সারের দাম ছিল ৪৯০ ডলার, তা এখন ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ বলেছেন, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা কৃষি ব্যবসাগুলোকে ‘প্রচণ্ড চাপের’ মধ্যে ফেলছে। তিনি বলেন, জ্বালানি ও সারের বর্ধিত ব্যয়ভার বহন করতে এরই মধ্যে বাড়তি চাপে পড়েছেন শস্য, পশুপালন ও দুগ্ধ খামারিরা।
এদিকে, কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু সারের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় বড় আঘাত হানতে পারে।
তাদের অনুমান অনুযায়ী, এর ফলে বিশ্বব্যাপী গমের দাম চার দশমিক দুই শতাংশ ও ফল-সবজির দাম পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে, বৈশ্বিক এই সঙ্কটে রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের মোট সার রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে রাশিয়া থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের উৎসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাশিয়া এখন বিশ্ববাজারে সারের বড় যোগানদাতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।



