ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার কামারপট্টিগুলোতে আবারো শুরু হয়েছে আগুন আর লোহার পুরোনো লড়াই। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টুংটাং শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেবিদ্বার পুরাতন বাজার, রাড়েরা বাজার, পোনরা বাজার, মাসিকারা বাজার ও পৌর ফতেহাবাদ এলাকার কামারশালাগুলো কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য দা, চাপাতি, বটি, ছুরি, চাকু ও কুড়াল তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কামারশিল্পীরা।
একাধিক কর্মকার জানায়, পরিশ্রম অনেক হলেও লাভ কম। কয়লা, লোহা ও শ্রমিক খরচ বাড়ছে। তারপরও তারা বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে কাজের ব্যস্ততা থাকলেও আগের মতো বেচাকেনা নেই। বাজার দখল করেছে বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি কারখানাজাত পণ্য। ঘরে বসে অনলাইনে এসব রেডিমেড পণ্য কেনার কারণে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখন নামমাত্র টিকে রয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, দেবিদ্বার উপজেলার শতাধিক পরিবার এখনো বংশপরম্পরায় কামারশিল্পের সাথে জড়িত। অন্তত ৮০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো এই পেশা একসময় ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রায় সব ধরনের লৌহজাত সরঞ্জাম তৈরি হতো এসব কামারশালায়। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্য।
সরেজমিনে দেবিদ্বার ও রাড়েরা বাজারের কামারপট্টিতে দেখা যায়, আগুনের লেলিহান শিখা আর হাপরের বাতাসে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কামারশালাগুলো। কয়লার আগুনে লোহা গরম করে হাতুড়ির আঘাতে তৈরি করা হচ্ছে ধারালো দা, চাপাতি ও বটি। দোকানের সামনে সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের কোরবানির সরঞ্জাম।
পোনরা বাজারের ৬০ বছর বয়সী প্রবীণ কামারশিল্পী মনোরঞ্জন কর্মকার বলেন, ‘ঈদের সময়টাই আমাদের ব্যবসার মূল মৌসুম। এ সময় দা, বটি, ছুরি ও চাপাতি বেশি বিক্রি হয়।’
তিনি আক্ষেপ করে আরো বলেন, ‘আগে হাতে বানানো জিনিসের কদর বেশি ছিল। এখন মানুষ কম দামে কোম্পানির তৈরি জিনিস কিনছে। অথচ আমাদের তৈরি জিনিসের মান এখনো অনেক ভালো। কিন্তু পুরোনো দা, বটি, ছুরি ও চাপাতি ধার দেয়ার জন্য যে কয়লা দরকার, তারও সঙ্কট রয়েছে। টিন কাঠের কয়লা ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে কিনতে হয়।
তিনি আরো বলেন, ‘পরিশ্রম অনেক, কিন্তু লাভ কম। কয়লা, লোহা আর শ্রমিক খরচ বাড়ছে। তারপরও আমরা বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’
রারেরা বাজারের বিল্লাল হোসেনের কামারের দোকানে আগুনে লোহা পুড়িয়ে নিখুঁতভাবে ধার তৈরি করতে দেখা যায় কারিগরদের।
তারা জানায়, আকার ও মানভেদে একটি চাপাতি তৈরি করতে ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। এছাড়া দা, বটি, ছুরি ও চাকুর দাম রাখা হয় ২০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে। আগের মতো এখন আর মানুষ হাতে তৈরি জিনিসের মূল্যায়ন করে না। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি এই পেশাটাকে টিকিয়ে রাখতে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ৩১টি অস্থায়ী হাট-বাজারে কোরবানিকে ঘিরে দা-ছুরির চাহিদা বাড়লেও বেশির ভাগ ক্রেতা ঝুঁকছেন হার্ডওয়্যার ও ক্রোকারিজ দোকানে বিক্রি হওয়া কারখানাজাত পণ্যের দিকে। এতে কামারশিল্পীরা ক্রমেই আর্থিক সঙ্কটে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাবে দেশের প্রাচীন এই শিল্প দ্রুত বিলুপ্তির পথে। অথচ গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কামারশিল্প এখনো বহন করছে বাংলার শত বছরের ইতিহাস। তাই ঈদ সামনে রেখে দেবিদ্বার উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে এখনো শোনা যায় লোহা পেটানোর টুংটাং শব্দ। তবে সেই শব্দের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের দীর্ঘশ্বাস।



