সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর উপর নির্মাণাধীন একটি সেতুর পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। সোমবার (১৭ মে) ভোররাতে যাদুকাটা নদীর পূর্ব পাশের ৩ ও ৪ নাম্বার পিলারের উপরে থাকা সেতুটির পাঁচটি গার্ডার ভেঙে পড়ে যায়।
সেতুটির নির্মাণকাজ তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ আট বছরেও শেষ হয়নি। এর আগে ২০২২ সালেও একই পাশে আরো দু’টি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গিয়েছিল।
স্থানীয়রা জানান, হঠাৎ করেই বিকট শব্দ হয়। পরে আমরা সকালে নদীতে গিয়ে দেখতে পাই সেতুটির পূর্ব পাশের পিলারের উপর থেকে পাঁচটি গার্ডার ভেঙে পড়ে গেছে।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্মাণাধীন ব্রিজের পাশ থেকে রাতে অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে ব্রিজের গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়েছে। পাশাপাশি শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি আর নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করার কারণে সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই দফায় দফায় গার্ডার ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। এর আগেও দু’টি গার্ডার পরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই সেতুর কাজ পুরোটাই খুবই নিম্নমানের হয়েছে, যে কারণে ভবিষ্যতের জন্যও প্রাণহানিসহ বাড় ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে যাদুকাটা নদীতে তিন বছর মেয়াদে ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ পায় তমা কনট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। যাদুকাটা নদীর বিন্নাকুলি-গরকাটি এলাকায় নির্মিত ৭৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির নির্মাণ ব্যয় কয়েক দফা বাড়িয়ে ১২৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
সেতুটির নির্মাণ কাজ ২০২১ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালেও শেষ হয়নি। গত ছয় মাস আগে যাদুকাটা নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুর সব পিলারের কাজ শেষ হলেও ১৫টি স্প্যানের মধ্যে ১২টি এবং ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে ৬০টির কাজ শেষ হয়। তবে এখনো বাকি আছে তিনটি স্প্যান ও ২০টি গার্ডারের কাজ।
স্থানীয় বাসিন্দা নাজিম মিয়া জানান, এই এলাকার মানুষের অনেক স্বপ্ন ছিল এই ব্রিজ নিয়ে। কিন্তু এই স্বপ্ন এখন ভেঙে পড়তেছে নদীতে। সেতুর শুরুতেই যদি এমন হয় তাহলে এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলেও এর উপর দিয়ে চলাচল করতে গেলেও যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ভয় কাজ করবে।
নজরুল শিকদার, কামাল উদ্দিন ভূঁইয়াসহ স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, সেতুটির মাধ্যমে জেলা সদরের সাথে তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি পর্যটন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের আশায় বুক বেঁধেছিল এলাকাবাসী। এই আশায়ই আজ নিরাশা হয়ে ধরা দিচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষকে।
যাদুকাটা নদীর বালু, পাথর সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ঘাগড়া গ্রামের হাকিকুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী সরকারের প্রভাবে ঠিকাদার ব্রিজের কাজ একবারে দুর্বল করছে। আর রাতের আধাঁরে এই ব্রিজের আশপাশের ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে রাতে নৌকা লোড করে। এই ড্রেজারের জন্যই আজকে আমাদের স্বপ্ন ভাঙছে। ভবিষ্যতে ব্রিজ দিয়ে আসা-যাওয়া করতে ভয় থাকবে মনের মধ্যে।
বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন বলেন, শুরু থেকেই ব্রিজের কাজ খুবই দুর্বল করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার ফলে এ নিয়ে দুইবার ব্রিজের গার্ডার ভেঙে পড়ে গেছে। আমি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ডিডি ও সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি কামরুজ্জামান কামরুকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হোক।
তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়েই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেতুটির পূর্ব পাশের নদীর মাঝখানে থাকা পিলারের পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। তবে কী কারণে ভেঙে পড়েছে সঠিক বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর এটি খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের তদন্তের পর বলা যাবে কী কারণে ভেঙে পড়েছে।



