আসন্ন ঈদুল আজহায় ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পদ্মাসেতুতে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের টোলপ্লাজায় সচল থাকছে মোট ১৯টি টোল বুথ। এছাড়া সেতুর দুই প্রান্তে যানবাহন ও মোটরসাইকেলের উপচেপড়া ভিড় ঠেকানোসহ টোল আদায় কার্যক্রম সার্বক্ষণিক সচল রাখতে নেয়া হয়েছে বিশেষ বাড়তি ব্যবস্থা।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সেতু কর্তৃপক্ষের পদ্মাসেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়াদিগন্তকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
গেল ঈদে চালু হওয়া সেতুর উভয় প্রান্তে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেম অর্থাৎ ইটিসি টোল বুথের সুবিধা এবারো ব্যবহার করতে পারছেন ঘরমুখো মানুষরা। যাতে করে ইটিসি কার্ডধারী গাড়িগুলো বিরতিহীনভাবে দ্রুত সেতু পার হতে পারে। একইসাথে বিশেষ বাড়তি ব্যবস্থায় জরুরি প্রয়োজনে মোটরসাইকেলের উপচেপড়া ভিড় ঠেকানোসহ টোল আদায় কার্যক্রম সার্বক্ষণিক সচল রাখতে চালু থাকবে অতিরিক্ত আরো সাময়িক টোল বুথ।
এদিকে সেতু বিভাগের আওতাধীন পদ্মাসেতু এলাকায় সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনগুলোর ট্র্যাফিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারকি এবং মনিটরিংয়ের জন্য টোলপ্লাজা ও টোল বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা চালু রাখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে পদ্মাসেতুর টোলপ্লাজার ট্রাফিক মনিটরিং সেন্টার থেকে সেতুর লোয়ার ডেক, আপার ডেক, সংযোগ সড়ক, ওজন স্কেলসহ দু’পাশের টোলপ্লাজাসহ মাদারীপুরের পাচ্চর পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার সড়কে মোট ১৮১টি অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের ক্যামেরা দিয়ে ফুল অপারেশনে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহাসড়কের হাসনাবাদ, আব্দুল্লাহপুর, ধলেশ্বরী টোলপ্লাজা, খানবাড়ী, মাওয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বাড়তি টহল টিম বসিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং বন্ধে টহল কার্যক্রম জোরদার করতে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ বিভাগ।
পদ্মাসেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গেল ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহনগুলো দ্রুত পদ্মাসেতু পাড়ি দিতে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে যানবাহন চলার নির্দেশনা দিয়েছিল সেতু বিভাগ। আর এতে করে এক্সপ্রেসওয়েতে যানজট না হওয়ার পাশাপাশি কোনো যানবাহনকে আটকে থাকতে হচ্ছে না। তাছাড়া ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে একটি করে ইটিসি লেনসহ মাওয়া প্রান্তে মূল সাতটি বুথ ও তিনটি মোটরসাইকেল বুথসহ মোট ১০টি এবং জাজিরা প্রান্তে মূল সাতটি বুথ ও দু’টি মোটরসাইকেল বুথসহ মোট নয়টি অর্থাৎ উভয় প্রান্ত মিলিয়ে সর্বমোট ১৯টি টোল বুথের মাধ্যমে টোল আদায় কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পরিচালিত হবে।
একইসাথে জরুরি প্রয়োজনে বাড়তি মোটরসাইকেলের উপচেপড়া ভিড় ঠেকাতে মাওয়া প্রান্তে আরো অতিরিক্ত অস্থায়ী বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঈদে সবগুলো বুথ সচল রাখতে অতিরিক্ত টোল কালেক্টর নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি টোলপ্লাজায় চালক ও যাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদানের সুবিধার্থে আইটিএসের আওতায় ভ্যারিয়েবল ম্যাসেজ সাইন সুবিধা রাখা হয়েছে।
এছাড়াও যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবেলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রেকার, ফায়ার ভেহিক্যাল ও অন্যান্য জরুরি সেবা যান প্রস্তুত রাখা, ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং একজন প্রশিক্ষিত আইটিএস এক্সপার্ট সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে যেকোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত ও সমাধানে সার্বক্ষণিক মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে যাত্রী ওঠানামা ও যানবাহন ব্যবস্থাপনা আরো সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে উভয় টোল প্লাজায় রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং উত্তর থানা সংলগ্ন ঢাকাগামী বাস-বে ঈদের পূর্বেই আংশিকভাবে উন্মুক্ত করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে, গেল ঈদে মাওয়া প্রান্তে জাজিরাগামী বাস বেটি চালু করা হয়েছিল।
এদিকে গত কয়েক দিনে পদ্মাসেতুর টোলপ্লাজায় ঈদে ঘরমুখো যানবাহনের বাড়তি চাপ এখনো শুরু না হলেও আগামী কয়েকদিনে যানবাহন চলাচল বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে গেলো ঈদুল ফিতরের মতো আসন্ন ঈদুল আজহায় এবারো ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক হবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় মাওয়া ও জাজিরাসহ দুই প্রান্ত দিয়ে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ১৯ হাজার ৫৩৩টি। এতে দুই প্রান্ত মিলে ক্যাশ, ক্রেডিট ও ইটিসিসহ মোট টোল আদায় হয়েছে দুই কোটি ৬৪ লাখ ৩৮ হাজার ৪৫০ টাকা।
গত বুধবার ২৪ ঘণ্টায় মাওয়া ও জাজিরাসহ দুই প্রান্ত দিয়ে মোট ২১ হাজার ২৫০টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এতে দুই প্রান্ত মিলে ক্যাশ, ক্রেডিট ও ইটিসিসহ মোট টোল আদায় হয়েছে দুই কোটি ৮৬ লাখ ৭২ হাজার ৯০০ টাকা। অথচ গেলো বছরের দুই ঈদের আগ মুহূর্তে ঈদুল ফিতরের সময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ হাজার এবং ঈদুল আজহায় সাড়ে ৩৩ হাজার যানবাহন পারাপার করা হয়েছিল।
সেতু কর্তৃপক্ষের পদ্মাসেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়াদিগন্তকে জানান, মাওয়া ও জাজিরা দুই প্রান্তের টোল প্লাজায় দু’টি ইটিসি লেন, মোটরসাইকেলের জন্য পাঁচটি টোল বুথ, মূল টোল বুথসহ মোট ১৯টি টোল বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে যানবাহনের বাড়তি চাপ এখনো পড়েনি। ঈদের আগ মুহূর্তে বাড়তি যানবাহনের চাপ সামাল দিতে টোলপ্লাজায় নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্বরত কর্মকর্তারাসহ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন, হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা নিবিড় সমন্বয় ও কার্যকর যোগাযোগ বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, পদ্মাসেতুর ট্রাফিক মনিটরিং সেন্টার থেকে সেতুর লোয়ার ডেক, আপার ডেক, সংযোগ সড়ক, ওজন স্কেলসহ দু’পাশের টোলপ্লাজাসহ প্রায় ২৩ কিলোমিটার সড়কে ১৮১টি সিসি ক্যামেরা যুক্ত থাকায় সেতুতে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম বা আইটিএস এর আওতায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মনিটরিং সেন্টার থেকে সার্বক্ষণিক তিনজন প্রশিক্ষিত অপারেটর জরুরি পরিস্থিতিতে পেট্রোল ও রেসকিউ টিমের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে।
আজ বিকেলে হাঁসাড়া হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন-আল-রশীদ জানান, শুক্রবার থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নির্বিঘ্ন ও পশুবাহী ট্রাকগুলো ঢাকায় প্রবেশ নিশ্চিত করাসহ অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং বন্ধে বিভিন্ন পয়েন্টে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে হাইওয়ে পুলিশের সাতটি ইউনিট কাজ করবে। এর মধ্যে পাঁচটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক পিকেট ডিউটি ও দু’টি মোবাইল টিম কাজ চালিয়ে যাবে।
পদ্মাসেতু উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আক্তার হোসেন বৃহস্পতিবার বিকেলে নয়াদিগন্তকে বলেন, ‘আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের বাড়তি প্রস্তুতি রয়েছে। একইসাথে ঈদপূর্ব ও ঈদপরবর্তী খানবাড়ী পয়েন্ট ও সেতু এলাকাসহ মাওয়া বাজার এলাকায় উত্তর থানা পুলিশের চারটি টহল টিম পর্যায়ক্রমে পিকেট ডিউটি চালিয়ে যাবেন। আমরা আশা করছি, গেল ঈদুল ফিতরের মতো এবারো ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক হবে।’



