সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ফসলহানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারঘোষিত মানবিক সহায়তা কর্মসূচির তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে কিছু জনপ্রতিনিধির আত্মীয়-স্বজন, কৃষিকাজের সাথে জড়িত নন এমন ব্যক্তি, প্রবাসী, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে।
কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাই প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের পছন্দের ব্যক্তি ও স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায়ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়েছেন বলে দাবি করেছেন কৃষকরা।
এছাড়া কৃষি সহায়তার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য অর্থ নেয়ার অভিযোগও উঠেছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নে প্রকাশিত ৪৮০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা ঘিরে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের আত্মীয়-স্বজনদের অগ্রাধিকার দিয়ে তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় গ্রামপুলিশ, প্রবাসী ও কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নাজমুল মিয়া ঢাকায় কর্মরত থাকলেও তাকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (মেম্বার) মিজানুর রহমানের ছেলে মৃদুলের নামও তালিকায় রয়েছে, যদিও তাদের পরিবার হাওরে কোনো জমি চাষ করেনি।
এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (মেম্বার) মাসুম আহমদের ভাই জাবেদ আলীর নামও তালিকায় রাখা হয়েছে, অথচ তাদের কোনো জমি তলিয়ে যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া প্যানেল চেয়ারম্যান রুজেল আহমদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের অন্তত ২০-২৫টি নাম তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, তালিকাভুক্ত অনেকেই কৃষি পেশার সাথে যুক্ত নন।
স্থানীয় কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার সাত কেয়ার জমি তলিয়ে গেছে, অথচ আমার নাম তালিকায় নেই। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের নাম দিয়েছেন। যাদের জমিই তলিয়ে যায়নি, তারাও সহায়তা পাচ্ছেন।’
এদিকে, শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান সবুজ মিয়া, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছয়ফুজ্জামান ও মহিলা সদস্য আমেনা বেগমের বিরুদ্ধে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য কৃষকদের কাছ থেকে ৫০০-১০০০ টাকা করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ১৭ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে ৪০ জন কৃষক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, শাল্লা উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় দুই মৃত ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। তারা হলেন— বাহাড়া ইউনিয়নের মুক্তারপুর গ্রামের রনু রঞ্জন সরকার ও সুধীন চন্দ্র দাস।
স্থানীয়রা জানান, রনু রঞ্জন সরকার গত বছর মারা গেছেন এবং সুধীন চন্দ্র দাস মারা গেছেন প্রায় ছয় মাস আগে। অথচ তাদের নামও সহায়তার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (মেম্বার) মিহির চৌধুরী বলেন, ‘আমার তালিকা অন্যরা করেছেন। তালিকায় কিছু মৃত ব্যক্তির নাম আসতে পারে। এগুলো বাদ দেয়ার বিষয়ে পরিষদে আলোচনা হয়েছে।’
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ‘তালিকায় মৃত ব্যক্তি বা অযোগ্য কারো নাম পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, ‘সুনামগঞ্জে এক লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অকৃষকদের নাম পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে তা বাদ দেয়া হবে।’
সূত্র : ইউএনবি



