রাজধানী ঢাকা আর বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে পরিণত হয়েছে ফেনী শহরতলীর লালপোল বেদেপল্লী। মহাসড়কের পাশেই এ পল্লীর অবস্থান হওয়ায় এখানে বসবাসরত ৮০ থেকে ১০০ পরিবারের সদস্যদের অনেকেই মাদককারাবারে জড়িয়ে পড়েছে।
বছরের প্রায় সময় মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও মূল নিয়ন্ত্রক সোহেল সবসময় থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাহিরে। পুলিশ ও মাদকদ্রব্যের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দিব্যি মাদককারবার চালিয়ে যাচ্ছে সোহেল।
সোহেল সদর উপজেলার কালিদহ ইউনিয়নের পশ্চিম সিলোনিয়ার চৌকিদার বাড়ির মরহুম বাহারের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, লালপোল বেদেপল্লীতে মাদকদ্রব্য পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করা হয়। সোহেলের নেতৃত্ব বড় একটা সিন্ডিকেট পল্লীর মাদক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সোহেলের সাথে রয়েছে শিরিন আক্তার নামে পল্লীর এক নারীও। তারা চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ বেদেপল্লীতেও মাদক সরবরাহ করে থাকে বলে একটি সূত্র জানায়।
জানা গেছে, এসব মাদক সাধারণত ফেনী সীমান্ত ও পাহাড়ি এলাকা থেকে এসে থাকে। সোহেল পল্লীর দক্ষিণ পাশে একটি দোকানে বসে এসব অপকর্মের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গত বছরের জুনে ইউনিয়ন শ্রমিক দল নেতা সাহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে বেদেপল্লীতে হামলা ও দোকানটি ভাঙ্চুর করা হয়।
একাধিক সূত্র জানায়, সোহেল পুলিশ প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতররের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মাদক বাণিজ্য করে থাকে। পল্লীতে বড় অভিযান হওয়ার আগেই সোহেলের কাছে পৌঁছে যায় গোপন তথ্য। এসব তথ্য পৌঁছে দেন জড়িত থাকা মাদকদ্রব্য বা পুলিশের কতিপয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ফলে অভিযানের আগে সেখান থেকে সরে পড়ে সোহেল। সরিয়ে ফেলা হয় মাদকও।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরীন কান্তার নেতৃত্বে বড় একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই দিন ৫০০ গ্রাম মাদকসহ তিনজনকে আটক করা হয়। অভিযানের আগেই তথ্য পেয়ে সরে পড়ে সোহেল। অভিযান শেষ হওয়ার পর সে বেরিয়ে আসে। সোহেলের পেছনে রয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা। বিশেষ করে জেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ স্বপন প্রকাশ ম্যাট স্বপন তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
মাসোয়ারার তালিকায় সাংবাদিক নামধারী পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তিও রয়েছে। সোহেল ৫ আগস্টের আগে জেলা যুবলীগের এক শীর্ষ নেতার প্রশ্রয়ে ছিলেন।
জানা গেছে, লালপোল বেদেপল্লীর মাদক সিন্ডিকেটে সোহেলের সাথে সোহাগ, জসিম, রাসেল, তারেক, বাবলু, দলু ও সোহেলের ছোট ভাই পারভেজ রয়েছে।
সোহেলের এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘সোহেলকে পুলিশ ধরে না। সে এলাকার সব পোলাপানকে মাদকের মাধ্যমে নষ্ট করেছে। এলাকায় মাদক ছড়িয়েছে তার কারণে।’
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সূত্রে জানা গেছে, বেদেপল্লীতে গত দেড় বছরে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে ১২৭টি মামলা দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৭৫টি ও ২০২৬ সালের ১৮মে পর্যন্ত ৫২টি মামলা দেয়া হয়। এসব মামলায় ২০২৫ সালে আসামি ৭৮ জন ও চলতি বছর ১৮মে পর্যন্ত আসামি ৫৪ জন। অভিযানে ২০২৫ সালে মোট সাড়ে ১৭ কেজি গাঁজা ও ১১৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয় এবং ২০২৬ সালের ১৮ মে পর্যন্ত ৪ দশমিক ৩৫০ কেজি গাঁজা ও ৫৭২ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল হামিদ বলেন, প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত সপ্তাহেও ম্যাজিষ্ট্রেট, বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্যের সমন্বয়ে ট্রাস্কফোস অভিযান চালিয়েছি। মহাসড়কের পাশে হওয়ায় বেঁদেরা অপকর্ম বেশি করতেছে। সোহেলকে ধরতে চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা নিয়ে কাজ করতেছি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি ও ক্রাইম) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, লালপোল বেদেপল্লী থেকে মাদক নির্মূল করতে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বেদেপল্লী সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং বসবাসরতদের ডাটাবেজ তৈরী প্রয়োজন।



