লিচুর গ্রাম মানিকপুরে যোগাযোগ সঙ্কটে লোকসানে উদ্যোক্তারা

যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে লাভের চেয়ে ক্ষতির মুখেই পড়তে হচ্ছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের।

সোহেল মিয়া, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ)

Location :

Dowarabazar
লিচুর গ্রাম মানিকপুর
লিচুর গ্রাম মানিকপুর |নয়া দিগন্ত

সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার মধ্যবর্তী মানিকপুর গ্রাম সবার কাছে পরিচিত ‘লিচুর গ্রাম’ হিসেবে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে লিচু কিনতে আসেন। কেউ কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন নিজ হাতে গাছ থেকে লিচু পেড়ে খাওয়ার আনন্দ নিতে। প্রতিবছর এই অঞ্চল থেকে কোটি টাকারও বেশি লিচু বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয় সুস্বাদু এ লিচু।

তবে স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও সুপরিচিত এই এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকার। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে লাভের চেয়ে ক্ষতির মুখেই পড়তে হচ্ছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন সুনজরে পাল্টে যেতে পারে এই এলাকার চিত্র। এলাকাটি শুধু লিচুর জন্য নয় উঁচু উঁচু পাহাড়েও নজর কাড়ে অতিথিদের। যত্ন করলে তা হতে পারে সম্ভাবনাময় এক পর্যটন শিল্পে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিরা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেন না। ফলে প্রায় ৩০০ টিরও বেশি লিচু বাগান ঘিরে গড়ে ওঠা পরিবারগুলোর দুর্ভোগ থেকেই যাচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মানিকপুর ছাড়াও পার্শবর্তী কচুদাইড়, বড়গল্লা, চানপুর, উলুরগাঁও ও গোদাবাড়ীসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার লিচু চাষের ওপর নির্ভরশীল। গত বছর কয়েক দফা শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল বাগান মালিকদের। এ বছর তীব্র তাপদাহে অনেক লিচু ঝরে ও পুড়ে গেছে। ফলনও কম হয়েছে। তারপরও কোটি টাকার লিচু ব্যবসার স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা।

ছাতক উপজেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং দোয়ারাবাজার উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন-চার কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নোয়ারাই ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার। বাজারের উত্তর-পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরে এগোলেই চোখে পড়ে সারি সারি লিচু বাগান। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় গাছে গাছে পাকা লিচুর রঙিন ঝলকানি নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের।

প্রতিকূল অবস্থা ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম করে উৎপাদিত লিচু বাজারজাত করছেন এখানকার চাষিরা। তবে কাঁচা রাস্তার কারণে বর্ষা কিংবা সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় চরম ভোগান্তি। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে পানি জমে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে বাইরের পাইকাররা বাগানে যেতে পারেন না। এতে বাধ্য হয়ে কম দামে লিচু বিক্রি করতে হয় মালিকদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, উঁচু উঁচু টিলা বেষ্টিত পুরো গ্রামজুড়ে চলছে লিচু সংগ্রহের উৎসব। নারী-পুরুষ ও তরুণ শ্রমিকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। অনেক শিক্ষিত বেকার তরুণও লিচু কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত যেন দম ফেলার ফুরসত নেই কারও।

চলতি মৌসুমে চৌমুহনী বাজারে প্রতিদিন লাখ লাক টাকার লিচু বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় এ হাট বসে সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পাইকারিভাবে লিচু কিনে দেশের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যান। বর্তমানে ১০০টি বড় আকারের লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। তুলনামূলক ছোট আকারের ১০০টি লিচুর দাম ৩০০ টাকার মতো।

লিচু বাগান মালিকরা জানান, এলাকার রাস্তাগুলো অত্যন্ত খারাপ হওয়ায় তাদের নিজেদেরই বিভিন্ন বাজারে গিয়ে লিচু বিক্রি করতে হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে বাইরের পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে লিচু কিনতে পারবেন। এতে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার বেশি লিচু বিক্রির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

দলবদ্ধ হয়ে লিচু কিনতে আসা ছাতকের বাসিন্দা, হাফিজ জাকির হোসাইন জানান, আমরা ১০ জনের একটি দল এসেছি লিচু খেতে। মানিকপুর গ্রাম,লিচুর গ্রাস হিসেবে জেলার মানুষ এক নামে চিনে। উঁচু উঁচু টিলা বেষ্টিত এই গ্রামের সুস্বাদু লিচুর বেশ সুনাম ও রয়েছে। আমরা প্রতিবছর লিচু নিতে আসি। কিন্তু এই এলাকার যোগাযোগের যে বেহাল অবস্থা তা দেখে খুবই কষ্ট হয়। যেখানে সাধারণ মানুষ হেঁটে চলা অসম্ভব সেখানে লিচু কিভাবে পরিবহন করবে উদ্যোক্তারা। রাষ্ট্রিয় ভাবে উদ্যোগ নিলে এলাকার লিচু চাষিরা ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবে। পাশাপাশি এলাকাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে মুগ্ধতা ছড়ায় তাতে করে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠবে।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খাঁন বলেন, ‘কৃষি বিভাগ থেকে সবসময় লিচু চাষিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। অনেককে লিচু চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। টিলা বেষ্টিত এ অঞ্চল লিচু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় আগ্রহীদের সোলার লাইটসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এলাকার রাস্তাগুলো কাঁচা হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই দুর্ভোগ নেমে আসে। এলজিইডি উদ্যোগ নিয়ে রাস্তা পাকা করলে স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগার আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।’