জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিলেট সফরকে ঘিরে পুরো নগরজুড়ে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
শুক্রবার (১ মে) সিলেটে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝেও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সিসিক প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ মন্ত্রী, এমপি, দলের নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ব্যস্ত সময় পার করেছেন। তারা সর্বশেষ প্রস্তুতির খবরাখবর নিয়েছেন।
এদিকে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসবিষয়ক ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে নগরী। এই সফরকে সামনে রেখে প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দফায় দফায় বৈঠক করছে। বেশ কয়েকটি প্রস্তুতিমূলক সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিলেট নগরের প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও স্থাপনাগুলো নতুন করে সাজানো হয়েছে। রাস্তা মেরামত, সড়কের পাশে গাছপালা ছাঁটাই, সরকারি ভবনের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ শেষ করা হয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন অপ্রয়োজনীয় ব্যানার-ফেস্টুন এরই মধ্যে অপসারণ করেছে। নগরীকে পরিচ্ছন্ন করতে দিনে-রাতে সমানতালে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মাধ্যমে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে।
সিলেট সার্কিট হাউস সংলগ্ন চাঁদনীঘাট এলাকা সাজানো হয়েছে নতুন করে। নগর ভবনে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্যান্ডেল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশা নিধন কার্যক্রমসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক দফতরের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠে কাজ করছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট, নজরদারি ও প্রটোকল অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরের সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিটি স্থান আগেভাগেই প্রস্তুত রাখা হচ্ছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে শুধু প্রশাসনিক নয়, জনমানুষের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নগরের বিভিন্ন স্থানে স্বাগত ব্যানার, আলোকসজ্জা ও দলীয় কর্মসূচির কারণে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বিকেলে নগরীতে স্বাগত মিছিল বের করা হয়। বিএনপি ছাড়াও অঙ্গ-সংগঠনের পক্ষ থেকেও গত দু’ দিন ধরে বের করা হচ্ছে স্বাগত মিছিল।
কলেজ শিক্ষক অধ্যাপক ফরিদ আহমদ বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী প্রথম সিলেট সফরে আসছেন এটা আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ। বিএনপি নেতাকর্মীদের পাশাপাশি পেশাজীবীরাও প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে উন্মুখ। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে সিলেটের উন্নয়নে নবদিগন্তের সূচনা হবে বলে আশা করছি।
নিরাপত্তায় কয়েক স্তরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফর নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময়ে মিলিত হন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভিভিআইপি প্রটোকল টিমের সদস্য ছাড়াও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিবি, সিটিএসবিসহ পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে ভিভিআইপি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ ব্যতীত নির্ধারিত রুট, অবস্থানস্থল ও ভেন্যুর ৫০০ মিটার পরিধি ও দুই কিলোমিটার উচ্চতায় ড্রোন বা উড্ডয়নযান ওড়ানো নিষিদ্ধ করেছে এসএমপি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সার্বিক প্রস্তুতি ও কর্মসূচি নিয়ে শুক্রবার সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: সারওয়ার আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখানে আসছেন মূলত খেলাধুলা উদ্বোধন করার জন্য। এটা আমাদের জন্য অনেক পাওয়া, একটা বড় পাওয়া। আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে, পাশেই বাসিয়া নদী এবং এই মরা নদী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খনন করেছিলেন, সেই নদীটা পুনঃখনন হবে। তাছাড়া আমাদের সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে অনেকগুলো প্রজেক্ট আছে, সেটিও উদ্বোধন করবেন। সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখবেন। একইসাথে আমাদের প্রবাসীদের জন্য একটি ওভারসিজ সেন্টার, প্রবাসী কল্যাণ ভবনে সেটির উদ্বোধন করবেন। এই প্রোগ্রামগুলো নিয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমরা আমাদের সবগুলো ভেন্যুতে যে প্রস্তুতি দরকার, মোটামুটি সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। আমাদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বরণ করে নেবো।
নিরাপত্তার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, সফরকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী খুব সাধারণ মানুষের মতো চলেন, সাধারণ মানুষের হয়ে চলেন। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ডিজায়ার করেছেন, আমরা সেভাবেই সফরসূচি চূড়ান্ত করেছি। সফরকালে কোনোভাবেই জনসাধারণের যেন কোনো কষ্ট যেন না হয়, অতিরিক্ত কোনো ধরনের মেজারমেন্ট যেন না হয়। প্রধানমন্ত্রী যখন আসবেন তখন রাস্তা বন্ধ হবে না, এরকম কোনো কিছু হবে না। জাস্ট সাধারণ মানুষ যেভাবে চলে, ঠিক সেভাবেই চলবে।
প্রস্তুতি দেখতে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে বাণিজ্যমন্ত্রী
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে জনগণ তাদের পছন্দের একটি সরকারের জন্য অপেক্ষা করেছে এবং সেই প্রত্যাশা ও স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটেছে বর্তমান সরকারের কার্যক্রমে।
শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সিলেট আগমন উপলক্ষে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ভেন্যু সিলেট জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আগামীকাল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনো ধরনের অসুবিধার আশঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে যে উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা দেয়া হয়েছিল, সেই পরিকল্পনার আলোকে সিলেটে বাস্তব উন্নয়ন কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এসব উন্নয়নের একটি সামগ্রিক চিত্র শনিবার সবার সামনে স্পষ্ট হবে।
তিনি আরো বলেন, সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের নানা দাবি-দাওয়া ও প্রত্যাশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে তুলে ধরবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মাহবুব-উল-আলম, সিলেট জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: সারওয়ার আলম, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো: মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ মহানগর ও জেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য, আগামীকাল শনিবার (২ মে) সকাল ১০টায় ওসমানী বিমানবন্দরে এসে পৌঁছবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে তিনি সুরমা নদীর তীরে চাঁদনিঘাট এলাকায় সিলেট নগরকে বন্যা ও জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা ও নগরের সৌন্দর্য বর্ধনে সিলেট সিটি করপোরেশন গৃহীত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার একটা মেগা প্রকল্প উদ্বোধন করবেন।
সকাল ১১টায় সিসিক আয়োজিত সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী নগরের জিন্দাবাজারে সিলেট ওভারসিজ সেন্টারের বহুতল ভবনের উদ্বোধন করবেন। পরে প্রধানমন্ত্রী সদর উপজেলার বাসিয়া নদী পুনঃখননের উদ্বোধন করবেন। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান এই বাসিয়া নদী খনন করেছিলেন। ৪৯ বছর পর তারেক রহমান দখলে-দূষণে মরে যাওয়া এই খাল পুনঃখনন করছেন।
সর্বশেষ বিকেল ৫টায় নগরের শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে দলীয় নেতাকর্মীদের এক সভায় বক্তব্য রাখবেন বিএনপি প্রধান তারেক রহমান। সন্ধ্যা ৭টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওসমানী বিমানবন্দর হয়ে ঢাকা ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।



