সিলেটে সাত শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে। ইসলামের অন্যতম প্রচারক হযরত শাহজালাল (রহ.)–এর (রহ.)–এর স্মৃতিবাহী এই আয়োজন প্রতিবছরের মতো এবারও ভক্ত-অনুরাগীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) যোহরের নামাজের পর সিলেট নগরের হযরত শাহজালাল (রহ.)–এর মাজার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় এ ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ঢাক-ঢোল, ব্যান্ডের বাদ্য আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ‘শাহজালাল বাবা কি জয়’, ‘লালে লাল, বাবা শাহ জালাল’ ধ্বনিতে হাজারো ভক্ত খালি পায়ে শোভাযাত্রা করে শহরতলীর লাক্কাতুরা চা-বাগানসংলগ্ন টিলার উদ্দেশে রওনা হন, যা মাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে।
ভক্তদের হাতে লাল কাপড়ে মোড়ানো দা, কুড়ালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দেখা যায়। তবে পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে কোনো জীবন্ত গাছ কাটা হয়নি। লাক্কাতুরা ও মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের আগে থেকে সংগ্রহ করা শুকনো ডালপালাই ব্যবহৃত হয়।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, টিলায় পৌঁছে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তবররুক বিতরণ করা হয়। পরে সংগৃহীত লাকড়ি নিয়ে ভক্তরা মাজারে ফিরে আসেন। সেগুলো মাজারের দিঘিতে তিনবার ধুয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা হয়। আসন্ন উরসের শিরনি রান্নায় এই লাকড়ি ব্যবহার করা হবে।
মাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী ৭ ও ৮ মে শাহজালাল (রহ.)–এর ৭০৭তম বার্ষিক উরস অনুষ্ঠিত হবে। উরস উপলক্ষে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহের অংশ হিসেবেই এই ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব পালিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক সূত্র ও লোককথা অনুযায়ী, এই উৎসবের সূচনা হয় একটি মানবিক ঘটনার মাধ্যমে। বলা হয়, এক কাঠুরে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে তার বিবাহযোগ্য কন্যাদের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বিষয়টি জানতে পেরে শাহজালাল (রহ.) তার অনুসারীদের নিয়ে প্রতীকীভাবে কাঠ সংগ্রহ করেন এবং সবাইকে ‘কাঠুরিয়ার কাজ’ করার মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদার ভেদাভেদ দূর করার শিক্ষা দেন। পরে তার অনুসারীরা ওই কাঠুরের মেয়েদের বিয়েতে আগ্রহী হন। সেই ঘটনা থেকেই সাম্য ও মানবিকতার প্রতীক হিসেবে ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসবের প্রচলন হয়।
মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন ছিল প্রাণবন্ত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন উরসও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্পন্ন হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
শতাব্দীপ্রাচীন এই ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি সিলেটের ঐতিহ্য, সাম্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে।



