হাবিবুল বাশার
রাজধানীবাসী যখন রাতের বেলায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন ডিবি অফিসের উল্টো পাশের ফুটপাথে কিংবা মগবাজার রেলগেটের অন্ধকার কোণে কোনো রকমে রাত কাটায় ছিন্নমূল মানুষেরা। সুজন বা রোকসানা বেগমদের মতো হাজারো ছিন্নমূল মানুষের জীবন কাটে এভাবে। তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলেও তা তেমন সফল হয়নি। তাদের কাছে পুনর্বাসন মানে শুধু মাথার ওপর একটি ছাদ নয়; এটি হারানো আত্মমর্যাদা ও আস্থার জটিল পুনর্গঠনের লড়াই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সরকারি বা বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠালেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। প্রয়োজন মানসিক ট্রমা থেকে মুক্তির সহায়তা, টেকসই কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি নিবিড় ফলোআপ। প্রশ্ন উঠছে পুনর্বাসনের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও মানুষ কেন বারবার অনিশ্চিত রাস্তাজীবনে ফিরে আসে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির গভীরে।
রাজধানীতে ছিন্নমূল মানুষের বাস মূলত জনসমাগমপূর্ণ পরিবহন টার্মিনাল ও খোলা ফুটপাথকে ঘিরে। সরেজমিন দেখা যায়, কমলাপুর, বিমানবন্দর ও তেজগাঁও রেলস্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় বহু মানুষ নিয়মিত রাত কাটায়। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালের আশপাশেও গৃহহীন শ্রমজীবীদের বড় অংশ অস্থায়ী ডেরা বেঁধেছে। উচ্চ আদালত সংলগ্ন মাজার এলাকা, গুলিস্তান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিন্নমূল মানুষের উপস্থিতি। যেখানে দৈনিক মজুরির কাজের সম্ভাবনা বেশি বা সহজে মানুষের সহায়তা মেলে কাওরান বাজার, মগবাজার কিংবা ব্যস্ত রেলগেটের পাশের ফুটপাথ ও ওভারব্রিজের নিচ সেসব স্থানই এখন তাদের প্রধান আশ্রয়।
চাঁদপুর থেকে আসা আঠারো বছর বয়সী সুজনের জীবনগল্প এই সঙ্কটের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। বহু বছর আগে মেঘনার ভাঙনে তলিয়ে যায় তাদের পৈতৃক ভিটা; সাথে ভেঙে পড়ে একটি স্বাভাবিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ভূমিহীন হয়ে পরিবারটি ঢাকায় আসে আশ্রয়ের খোঁজে। মা-বাবাকে হারিয়ে আজ সুজন একা; সাথে আছে তার তরুণী স্ত্রী। ডিবি অফিসের উল্টো পাশের ফুটপাথেই তাদের সংসার। সারা দিন ভাঙারি কুড়িয়ে সে আয় করে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। গ্রীষ্মের দাবদাহ কোনোভাবে সহ্য হলেও হাড়কাঁপানো শীত আর বর্ষার অবিরাম বৃষ্টি তাদের জীবনকে অসহনীয় করে তোলে।
মগবাজার রেলগেটের পাশে থাকা রোকসানা বেগমের গল্প আরো বেদনাদায়ক। একাত্তরের যুদ্ধে বাবা-মা হারানো রোকসানা মেট্রিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। ক্যান্টনমেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজও করেছেন। এক সময় অভাব ছিল না; কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা তার জীবনকে ভেঙে দেয়। দুই মাস হাসপাতালে থাকার পর ফিরে এসে দেখেন, পাশে নেই কোনো আপনজন। আজ সহায়-সম্বলহীন এই নারী মগবাজারে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন এবং জীবিকার তাগিদে ভিক্ষা করেন।
কেন পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে মানুষ বারবার রাস্তায় ফিরে আসে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায় গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সঙ্কট। দীর্ঘদিন ফুটপাথে বসবাস করতে করতে তারা এক ধরনের নিয়মহীন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে; ফলে আশ্রয়কেন্দ্রের শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ অনেকের কাছে বন্দিত্বের মতো মনে হয়। কেন্দ্রের ভেতরে তাৎক্ষণিক উপার্জনের সুযোগ না থাকা এবং বাইরে দ্রুত আয় করার সম্ভাবনা তাদের টেনে আনে। এর সাথে যুক্ত হয় তীব্র মানসিক ট্রমা, একাকিত্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তি। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা রোধে পুনর্বাসনকে কেবল ‘আশ্রয়’ হিসেবে না দেখে ‘পুনর্গঠন প্রক্রিয়া’ হিসেবে ভাবতে হবে। প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নিশ্চিত কর্মসংস্থান, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ। নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ইচ্ছেপূরণ মানবিক ফাউন্ডেশনের প্রচার সম্পাদক ইমরান উদ্দিনের মতে, ছিন্নমূল মানুষদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে বড় বাধা তাদের আস্থার সঙ্কট। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তাদের সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে দেয় না।
তাই নিয়মিত যোগাযোগ, নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি মানসিক সহায়তা এবং ধৈর্যের সাথে মৌলিক চাহিদা পূরণ- এই প্রক্রিয়াই বিশ্বাসের ভিত তৈরি করে। এটি তাৎক্ষণিক সমাধান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক উদ্যোগ।
পরিশেষে বলা যায়, সুজন বা রোকসানা বেগমদের মতো মানুষের টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে এগোতে হবে। কেবল তখনই ঢাকার ফুটপাথ থেকে গৃহহীনতার এই অন্ধকার ছায়া সরে যাবে, আর প্রতিটি মানুষ ফিরে পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা।



