সুশাসনের জন্যে নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আমরা সবাই জুলাই আন্দোলনে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। এ রক্তের ঋণ শোধ করার জন্য সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারি ও বিরোধী দলকে সমবেত ও সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা জরুরি। জুলাই আন্দোলনে যে ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল তাতে শিথিলতা দেখা দিয়েছে এবং বিভাজনগুলো কাম্য নয়। সরকার বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। আমরা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের যারা প্রাণ দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, এই রক্তের ঋণ শোধ করার জন্যে সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ঐকমত্য কমিশনের এই সদস্য বলেন, মনে হচ্ছে সরকার পুরনো পথে হাঁটছে। স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোর যে দলীয়করণ, প্রধানমন্ত্রী যে সর্বময় ক্ষমতার মালিক, চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সের অভাব এগুলোর জন্যে যে অতীতের সরকার স্বৈরাচারী সরকারে পরিণত হয়েছে এবং গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এগুলোর বিহিত করার জন্যই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে। গণভোট হয়েছে, যা মানুষ অনুমোদন করেছে কতগুলো সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কারের ব্যাপারে। জনগণ সম্মতি দিলেও বিএনপি এসব নিয়ে টালবাহানা শুরু করেছে।
নয়া দিগন্ত : আপনার কেন মনে হচ্ছে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে?
বদিউল আলম মজুমদার : অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৩৩টি অধ্যাদেশ হয়েছে, যার চারটি সরকার রহিত করেছে যেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ইত্যাদি। আমাদের শাসনব্যবস্থায় এসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারত। ১৬টি অধ্যাদেশ তারা সংসদে উত্থাপন করবে না আর ১৫টি যাচাই-বাছাই করে উত্থাপন করবে। গুম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন ইত্যাদি। এখন তো দেখছি তারা পশ্চাৎপদ হয়ে পুরনো পথে হাঁটছে। পুরনো বা উল্টো পথে হাঁটলে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না। তার মানে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা আমাদের ওপর জেঁকে বসেছিল এটা আবার ফিরে আসতে পারে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও। এর ফলে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনা যাবে না। একই সাথে যারা ক্ষমতায় আছে তাদের জন্য তা কল্যাণ বয়ে আনবে না। কারণ তারা সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছে বিশেষত জুলাই জাতীয় সনদের ব্যাপারে। গণভোটের ব্যাপারেও অঙ্গীকার করেছে। তারাও গুমের শিকার, নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার এবং এগুলোর ক্ষেত্রে আমরা আশা করেছিলাম যে, নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল যে তারা এমন কিছু আইনি রক্ষাকবচ সৃষ্টি করবে যার মাধ্যমে এগুলোর পুনরাবৃত্তি না হয়। এটা হতাশাব্যঞ্জক তারা এগুলো সংস্কারের ব্যাপারে টালবাহানা করছে। তারা অনীহা প্রকাশ করছে; কিন্তু জনগণ তা মেনে নিচ্ছে না। একটা বিরাট জনগোষ্ঠী যেমন গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে।
নয়া দিগন্ত : তাহলে এখন উপায় কি?
বদিউল আলম মজুমদার : সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ সংস্কারের ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছে। আশা করি, সরকার এসব বিবেচনা করে যে পথে হাঁটছে, পুনর্বিবেচনা করবে, মানুষের কল্যাণ হয় এমন অর্থাৎ যে ব্যবস্থায় স্বৈরাচারী শাসন মানুষের ওপর জেঁকে বসার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বাধা সৃষ্টি করবে সেগুলোর ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
নয়া দিগন্ত : এখন বলা হচ্ছে অধ্যাদেশগুলো ত্রুটিপূর্ণ, অন্তর্বর্তী সরকার এসব নিয়ে হযবরল করে গেছে।
বদিউল আলম মজুমদার : কিন্তু তারা যে অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করেছে, অনেক অধ্যাদেশ আছে যেগুলো অপব্যবহার করা যাবে। যেমন স্থানীয় সরকারে প্রশাসক বসানো। বিএনপির ৩১ দফায় তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট বলা আছে তারা প্রশাসক বসানোর বিপক্ষে। প্রশাসক বসানো সংবিধানের পরিপন্থী। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই স্থানীয় সরকার পরিচালনা করবেন। এগুলো আদালতের রায়ের পরিপন্থী। বিখ্যাত কুদরত ইলাহি পনির মামলার রায়ে আদালত বলেছে স্থানীয় সরকার যদি সরকারি কর্মকর্তা কিংবা তাদের তল্পিবহরা পরিচালনা করে, এগুলো রাখারই দরকার নেই। তা সত্ত্বেও সরকার চারটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করছে যেগুলো তাদের এই ক্ষমতা দেবে। অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যায় যদিও তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে জেলা প্রশাসকের ব্যাপারে। তো এগুলো সন্দেহের উদ্রেক করে। যেগুলো মানুষের কল্যাণ করবে সেগুলো অনুমোদন না করে যেগুলো তাদেরকে অপব্যবহার করে ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে সেগুলো অনুমোদন দিচ্ছে। ৯৮টি অধ্যাদেশ তারা অনুমোদন করেছে যেগুলোর অনেকগুলো গুরুত্বহীন। ১১টির মতো অধ্যাদেশ রয়েছে যেগুলো বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধুর পরিবার সংক্রান্ত। তারা গুরুত্বপূর্ণগুলো উপেক্ষা করছে; কিন্তু অগুরুত্বপূর্ণগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে এটাই সন্দেহের সৃষ্টি করে। মানুষের মধ্যে আশঙ্কা জাগ্রত করে।
নয়া দিগন্ত : পুরনো রাষ্ট্রকাঠামো বা অলিগার্ক শ্রেণীর সাথে তাহলে আগামী দিনের রাজনৈতিক শক্তির মোকাবেলাটা কেমন হবে?
বদিউল আলম মজুমদার : জুলাই অভ্যুত্থানের আগে সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পরেও এটা অব্যাহত ছিল; কিন্তু দিন দিন এটা শিথিল হয়েছে। এই জাতীয় ঐক্য আরো শিথিল হতে পারে, শিথিল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা যদি এগুলো উপেক্ষা করে। গণভোট বা গণভোটের রায় একই সাথে অধ্যাদেশগুলো যদি অনুমোদন না করে। এই ঐক্যটা আরো সুদৃঢ় হওয়ার ব্যাপারে আরো শিথিল হবে, বিভক্তির সৃষ্টি হবে এবং এই বিভক্তি কোনোভাবেই কাম্য নয় বিশেষত বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। সমবেতভাবে, সম্মিলিতভাবে, এগিয়ে আসা জরুরি। বিভাজনগুলো কাম্য নয় এবং সরকার বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে বিশেষত রক্তের ঋণ শোধ করার জন্য। আমরা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের যারা প্রাণ দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, এই রক্তের ঋণ শোধ করার জন্য তারা সঠিক সিদ্ধান্ত দেবে।
নয়া দিগন্ত : কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা এনে আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপির মতো এত বড় একটা রাজনৈতিক দলও যদি এখন ব্যর্থ হয় তাহলে জনগণ যাবে কোথায়?
বদিউল আলম মজুমদার : ব্যর্থ যদি না হয় সে জন্য আমরা সোচ্চার। আমরা সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি তারা যেন পুরনো পথে না হাঁটে। তারা যেন সংস্কারগুলো করে। তারা যেনো সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। যাতে ওই ভুলগুলো না করে।
নয়া দিগন্ত : বিএনপির কাছে তো জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার অনুসৃত রাজনীতির পথ বা উদাহরণ আছে।
বদিউল আলম মজুমদার : হ্যাঁ এটাই তো আমাদের আকাক্সক্ষা। এটাই আমাদের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় বেগম খালেদা জিয়া অতিমানব ছিলেন না। তারাও ভুল করেছেন। তবুও দেশের কল্যাণের জন্যে তারা অনেক কিছু করেছেন যে পথটা বিএনপির জন্য অনুসরণীয় হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
নয়া দিগন্ত : সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সংগঠনগুলো কি আরো বেগবান হবে?
বদিউল আলম মজুমদার : নাগরিক সংগঠন, সিভিল সোসাইটি থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরাই কিন্তু সোচ্চার হচ্ছে। এর প্রতি কর্ণপাত করে ক্ষমতাসীন বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।
নয়া দিগন্ত : গণমানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা কি আগের চেয়ে কঠিন হয়ে গেল, যেখানে তাদের আশা আকাক্সক্ষার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলো অঙ্গীকার করেছিল?
বদিউল আলম মজুমদার : এখন মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস যখন সৃষ্টি হয়, সবাই বিশ্বাস করেছিলাম বিএনপি পুরনো পথে হাঁটবে না, তারা গণভোটের রায়কে মাথা পেতে নেবে, তারা সুস্পষ্টভাবে বলেছে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করবে। পরিপূর্ণভাবে তারা বাস্তবায়ন করবে। এখন তারা টালবাহানা করছে, অধ্যাদেশগুলো নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রদর্শন করছে তখন মানুষের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং সন্দেহ সৃষ্টি হলে সরকার দুর্বল হয়। সরকার যখন জনগণের আস্থায় থাকে, সরকারের সম্পর্কে জনগণের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে তখন সরকার সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকার শক্তিশালী হয়। জনগণের আস্থার অভাব সরকারকে দুর্বল করে। তারা নিজেরা যেন দুর্বল হওয়ার চেষ্টা থেকে দূরে থাকে। দুর্বল হওয়ার পথ থেকে তারা যেন বিরত থাকে।
নয়া দিগন্ত : আপনি বলেছিলেন নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করতে প্রয়োজনে কমিশন নিজেই আইন তৈরি করতে পারে। গত নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, আগামীতে নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় হবে এমন আশা যেমন আছে তেমনি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
বদিউল আলম মজুমদার : আপিল বিভাগের একটা বিখ্যাত রায় আছে, আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাসেম, ওই মামলার রায়ে বলা হয়েছে যে, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে আইনকানুন বিধিবিধানের পরিবর্তনও করতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনে কমিশনকে এই ক্ষমতাও দেয়া আছে। কমিশনের অগাধ ক্ষমতা। তারা বলে যে হাত অনেক লম্বা; কিন্তু ওই লম্বা হাতটা প্রদর্শন করতে হবে জনগণের কল্যাণে। সুষ্ঠু নির্বাচনের খাতিরে। তাদের মেরুদণ্ড শক্ত হতে হবে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য তাদের যা কিছু করার তাই করতে হবে।



