আবদুল কাইয়ুম
- হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন সংবাদকর্মীরা
- ঘটছে হামলা ও গণমাধ্যম বন্ধের ঘটনাও
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিভিন্ন সাংবাদিক নেতা ও বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, গণমাধ্যমের নির্দিষ্ট কোনা আইন নেই। এতে করে সাংবাদিকরা কাজ করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সঠিক আইন না থাকার কারণে গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাও কম নয়। তা ছাড়া গণমাধ্যমের অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। এতে করে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশে বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানান সংবাদকর্মীরা। তা ছাড়া আইনি কাঠামো না থাকায় নির্দিষ্ট নিয়মে পাচ্ছেন না বেতনভাতাও।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৫ সালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ৩৮৮ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সময়ে দেশে তিনজন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি হলো গাজীপুরে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিন নিহত হন। নির্যাতনের শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে ১২২ জন সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন এবং ১২৫ জন প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। প্রকাশিত সংবাদের জেরে অন্তত ২৩৫ জন সাংবাদিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। সর্বোচ্চ নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ঢাকা জেলায় ৯৯ জন।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় দু’জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ১৪৭ জন আহত, ৮৪ জন লাঞ্ছিত, ৩৬ জনকে হুমকি ও ৪৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়াও গত বছর সংবাদপত্র অফিসে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সাংবাদিকদের হত্যাসহ বিভিন্ন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত জানুয়ারিতে ১৬ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনেই অন্তত ৪৭ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বাংলাদেশ টাইমস’-এর ২১ জন সাংবাদিককে তাদের কর্মস্থল থেকে একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখা হয়, যা মুক্ত সংবাদপত্রের অন্তরায়। বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও আইনিসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছিলেন ৫১ জন সাংবাদিক। ফেব্রুয়ারিতে সাংবাদিকদের প্রতি নানা ধরনের সহিংসতার ঘটনা ছিল ১১টি।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মার্চ মাসে ৩৪টি হামলার ঘটনায় ৫৯ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত ৩৩, লাঞ্ছনার শিকার তিন এবং হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১২ সাংবাদিক। এ ছাড়াও একজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর অধীনে আট সাংবাদিককে আসামি করে পৃথক দু’টি মামলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষের দিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ (খসড়া) প্রণয়ন করা হয়। যার লক্ষ্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণ এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই কমিশন গণমাধ্যম বা ব্রডকাস্টারদের অনিয়ম তদন্ত, আচরণবিধি প্রণয়ন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
তবে এসব বিশেষজ্ঞ জানান, বাংলাদেশ এখন গণমাধ্যম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রস্তাবিত সম্প্রচার অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৬ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। এই দু’টি খসড়া আইন থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার একটি পুরনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই করতে চায়। বাস্তবতা হলো গণমাধ্যমের জগৎ আইনের চেয়ে অনেক দ্রুত বদলে গেছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা আমরা শুধু মুখেই বলি। গণমাধ্যম কিভাবে স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখবে আদতে তার কোনো আইনি কাঠামো নেই; যে কারণে গণমাধ্যম কোনোকালেই স্বাধীন ছিল না এবং বর্তমানেও নেই। কোনো না কোনো গোষ্ঠীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেক্ষেত্রে সরকার, রাজনৈতিক দল বা দলের নেতা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বিজ্ঞাপনদাতা, এমনকি মালিক কর্তৃকও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। যে কারণে গণমাধ্যম কোনোকালেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। আইনি কাঠামো না থাকায় গণমাধ্যম যেমন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, তেমনি অনেক সময় গণমাধ্যম অতিরঞ্জিত করে ফেলে। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা ভোগ করতে গিয়ে কেউ যেন আমাদের দ্বারা হেনস্তা অথবা ভোগান্তির শিকার না হন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, গত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের আমলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না, এগুলো নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ছিল। এতে সেখানে সাংবাদিকতা ছিল না, বরং নিজেদের লোক হিসেবে কাজ করত। যারাই স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করতে চাইত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতো। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের সুরক্ষা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানানো হলেও বিভিন্নভাবে কালক্ষেপণ করেছে।
গণমাধ্যম নিয়ে অনেক প্রস্তাবনা দিলেও বাস্তবায়ন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ পেলেও সেটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে পারেনি।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে প্রত্যাশা করছি গণমাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। তবে তারা অনেক ক্ষেত্রে চুপ রয়েছে, তা ছাড়া আগের মতো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ সরকারের বিরুদ্ধে লিখলেই তার ওপর চড়াও হচ্ছে। আমরা চাই গণমাধ্যমে প্রকৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া হোক। সমালোচনা করার স্বাধীনতা আইনি কাঠামোর মধ্যে দেয়া দরকার। গণমাধ্যম সুরক্ষা আইন থাকলে হুমকি ও গণমাধ্যম বন্ধ করতে পারবে না।
মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ^বিদ্যালয়ের সংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান বলেন, গণমাধ্যমের জন্য একটি আইনি কাঠামো থাকা জরুরি; তবে নৈতিকতা তার চেয়ে বেশি জরুরি। সাংবাদিকদের জন্য ইতোমধ্যে কিছু রয়েছে। কিন্তু তার কেন প্রতিফল নেই। অনৈতিকতার সাথে কাজ করার কারণে আইনও কাউকে ঠেকাতে পারছে না। সাংবাদিক সংগঠনগুলো ঠিকমতো সুস্থধারার প্র্যাকটিস করছে না। সবার আগে সমাধান হচ্ছে পক্ষপাতমুক্ত হওয়া, সত্যের পথে দায়বদ্ধ থাকা।
তিনি আরো বলেন, গণমাধ্যমের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা কখনো সম্ভব না। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের সরাসরি কোনো আইন নেই। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা ঠিক না। সে ক্ষেত্রে নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। সাংবাদিকতার নৈতিকতা ঠিক থাকলে বাইরে থেকে বলতে হবে না, সে নিজেই উচিত-অনুচিত বুঝবে। বর্তমানে আমাদের দেশে নৈতিক সাংবাদিকতার চর্চা কম। সত্যের প্রতি নয়, সাংবাদিকতরা নিজের স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধ যার কারণে এ অবস্থা।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনটি- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। তারা এটিকে ব্যবসায়িক নাকি জনস্বার্থে করবে তা ঠিক করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করে ব্যবসা করতে পারবে না। অন্য দিকে সাংবাদিকদেরও দায় আছে। কারণ সাংবাদিকরা নিজেই দাসত্ব করতে চায়। অনেকেই টিকে থাকার জন্য চাটুকারিতা করতে থাকে। তাই সাংবাদিকদেরকে সাংবাদিক হয়ে উঠতে হবে।
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন তার বক্তব্যে জানান, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আমরা সব অংশীদারের সাথে আলোচনা শুরু করেছি। গণমাধ্যমের ওপর নির্যাতনের যে ইতিহাস তা ফ্যাসিবাদের কর্মকাণ্ডের অঙ্গ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে গণমাধ্যমের অধিকার এবং স্বাধীনতা যারা চর্চা করেছেন সেই গণমাধ্যমকর্মীদের নির্যাতনের যে অপরাধ তা আমরা তামাদি হতে দেবো না।
এ অপরাধকে চিহ্নিত করতে আমরা সাংবাদিক প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে ইতোমধ্যেই তালিকা তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে এখন সামাজিক মাধ্যম ইউটিউব ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নানা সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের কারণে ফ্যাক্টচেকিং ছাড়া অনুমাননির্ভর কোনো সংবাদ প্রকাশ কোনোমতেই ঠিক হবে না।



