বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রযুক্তিটির দ্রুত বিস্তার শুধু কাজের ধরনই বদলে দিচ্ছে না, বরং শ্রমবাজারের কাঠামোতেও আনছে বড় পরিবর্তন। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে করপোরেট কাজ- সব ক্ষেত্রেই জটিল কাজ সহজ হয়ে উঠছে এআই ব্যবহারে। একই সাথে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের পেশা। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়- এই পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের চাকরির বাজার কতটা প্রস্তুত? বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পখাতের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ও শিল্পখাতে এআইর ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশে সেই অগ্রগতি এখনো সীমিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে দেশের চাকরির বাজার পিছিয়ে পড়ছে কি না- এ প্রশ্ন এখন নীতিনির্ধারক, গবেষক ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে অধিকাংশ চাকরির জন্য নতুন ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন হবে, যার বড় অংশই এআই-নির্ভর। বিশেষ করে ডাটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং ও অটোমেশনের মতো ক্ষেত্রে দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো এই দক্ষতার চাহিদা তুলনামূলক কম এবং চাকরির বিজ্ঞাপনেও সেসব দক্ষতার উল্লেখ খুব বেশি দেখা যায় না। ফলে এক দিকে প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে শ্রমবাজার সেই গতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো এর তাত্ত্বিক নির্ভরতা। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পুরনো সিলেবাসে পাঠদান চলছে, যেখানে এআই, ডাটা সায়েন্স বা আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব নেই। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে বঞ্চিত থাকে। আন্তর্জাতিক সূচকেও দেখা গেছে, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
এই বাস্তবতায় একটি দ্বৈত সঙ্কট তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের বড় অংশই কাজের জন্য প্রস্তুত নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান যোগ্য জনবল না পাওয়ার অভিযোগ করছে, আবার বিপরীতে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে; অর্থাৎ দক্ষতার অভাব ও বেকারত্ব- দু’টি সমস্যা একসাথে বিদ্যমান।
এই সঙ্কটের মূল কারণ শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হচ্ছে, তা শিল্পখাতের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার শিল্পখাত যে দক্ষতা চায়, তা শেখার সুযোগও শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্তভাবে পাচ্ছে না। ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ এখনো সীমিত। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ল্যাব, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবও রয়েছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দেশের তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে এআই টুল ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। লেখালেখি, গবেষণা কিংবা দৈনন্দিন কাজ- বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা এআই ব্যবহার করছে। কিন্তু এই ব্যবহার অনেক সময় টুল-নির্ভর পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে; প্রযুক্তির গভীর বোঝাপড়া কিংবা নতুন কিছু তৈরির সক্ষমতা এখনো সীমিত।
সরকার দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের স্কিল ডেভেলপমেন্টে কাজ করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো পুরোপুরি এআই-কেন্দ্রিক নয়। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় আরো সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটোমেশন আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেসব কাজ মেশিন দিয়ে করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে চাকরি কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার অসম বণ্টনের কারণে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য আরো বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।
তারা আরো বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় এখনই পরিবর্তন আনা জরুরি। এআই ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ডিগ্রির পাশাপাশি দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়। একই সাথে সবার জন্য প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এআই নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় সঙ্কট দক্ষতার ঘাটতি। এআই গবেষক মেজবাহ উদ্দিন রাফি বলেন, ‘এআই নিজে সমস্যা নয়, সমস্যা হলো মানুষকে প্রস্তুত না করা। সময়মতো দক্ষতা বাড়াতে না পারলে অনেক চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে।’ তার মতে, শিক্ষাব্যবস্থাকে দ্রুত বাস্তবমুখী করা না গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সঙ্কট তৈরি হতে পারে।
শিল্পখাতের বিশ্লেষকরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে কম শ্রমিক দিয়েই বেশি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষণ না দিলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ‘স্কিল গ্যাপ’ কমানো। একাধিক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে ডিগ্রির চেয়ে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। জেনারেটিভ এআই, স্টেম শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতায় জোর না দিলে তরুণ প্রজন্ম পিছিয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো পুরনো কারিকুলাম ও সীমিত গবেষণা সুযোগ। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা, শিল্প ও নীতিনির্ধারণ- এই তিন খাতের মধ্যে সমন্বয় এখনো দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না এবং এআইর পূর্ণ সুবিধাও পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ও মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান চাকরির বাজারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হাতে-কলমে দক্ষতা। শুধু সার্টিফিকেট বা তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে চাকরি পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রজেক্টে কাজ করার সক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাই এখন নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তি শিক্ষার বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ এম কায়কোবাদ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে অ্যালগরিদম, লজিক ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তি বাড়াতে হবে। তার মতে, এআই যুগে টিকে থাকার জন্য মৌলিক চিন্তাশক্তি অপরিহার্য।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী সৈয়দ আখতার হোসাইনও একই মতপ্রকাশ করে বলেন, দেশের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অ্যাকাডেমিক শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে বিস্তর ফাঁক। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে এই অমিলের কারণেই অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে সম্ভাবনা ব্যাপক হলেও চাকরির বাজার এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি দ্রুত দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে। তাই সময়ের দাবি- শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তির সাথে দ্রুত অভিযোজন।



