জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষীর দাবি

বিডিআর হত্যাকাণ্ড দেখে ফেলায় আমার স্বামীকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে

‘আমার স্বামী বিডিআর হত্যাকাণ্ড স্বচক্ষে দেখার কারণেই তাকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এই একটি বাক্যেই পিলখানা ট্র্যাজেডির পর নিখোঁজ স্বামী নজরুল ইসলামের পরিণতি আর দীর্ঘ ১৬ বছরের জমে থাকা হাহাকার প্রকাশ করলেন স্ত্রী মুন্নী আক্তার।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

‘আমার স্বামী বিডিআর হত্যাকাণ্ড স্বচক্ষে দেখার কারণেই তাকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এই একটি বাক্যেই পিলখানা ট্র্যাজেডির পর নিখোঁজ স্বামী নজরুল ইসলামের পরিণতি আর দীর্ঘ ১৬ বছরের জমে থাকা হাহাকার প্রকাশ করলেন স্ত্রী মুন্নী আক্তার।

গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে উপস্থিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে এভাবেই নিজের জবানবন্দী দেন তিনি। জবানবন্দী দেয়ার সময় মুন্নী আক্তার জানান, তার নাম মুন্নী আক্তার, বয়স ৩৫ বছর। তার স্বামী মো: নজরুল ইসলাম বিডিআর হাসপাতাল পিলখানায় মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড স্বচক্ষে দেখে ফেলায় প্রাণের ভয়ে তিনি পিলখানার দেয়াল টপকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তারা পিলখানার ১ নম্বর গেটের সামনে থাকতেন। জীবন বাঁচাতে নজরুল ইসলাম প্রথমে কেরানীগঞ্জে আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন এবং পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ‘মধুমতি ক্লিনিকে’ নিজের পরিচয় গোপন করে ‘নুরুল আমীন মুন্সী’ নামে চাকরি নেন। সেখানে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে স্টাফ কোয়ার্টারে বসবাস শুরু করলেও প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ডিউটি করতেন নজরুল।

বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মুন্নী আক্তার সেই অভিশপ্ত দিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ১৫ মার্চ ২০১০ তারিখে ডিউটিতে গিয়ে নজরুল আর বাসায় ফেরেননি। পরদিন ক্লিনিকে গিয়ে সহকর্মী রুহুল আমীন শেখের কাছে তিনি জানতে পারেন যে, আগের দিন কোটালীপাড়া বামতার মোড় এলাকা থেকে সাদা পোশাকে পাঁচ-ছয়জন লোক নজরুলকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। বাধা দিতে গেলে রুহুল আমীনকেও মারধর করা হয়। এই অপহরণের ঘটনায় ১৭ মার্চ কোটালীপাড়া থানায় মামলা করেন মুন্নী। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাদের বাড়িতে আসতে থাকেন।

একদিন ঝালকাঠি থেকে ডিএসবি সদস্যরা এসে তার শ্বশুরকে জানান যে, বাগেরহাটের শরণখোলাসংলগ্ন বলেশ্বর নদী থেকে নজরুলের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নজরুলের ছোট ভাই জাহিদুল ইসলাম শাহীন, যিনি নিজেও বিডিআরে কর্মরত ছিলেন, পত্রিকায় লাশের ছবি দেখে তার ভাইকে শনাক্ত করেন। মুন্নী আক্তার স্বজনদের নিয়ে শরণখোলা থানায় গিয়ে নজরুলের পরিধেয় পোশাক শনাক্ত করেন। ততক্ষণে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে নজরুলকে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসকের সহায়তায় ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে পুনরায় পারিবারিক কবরস্থানে নজরুলকে দাফন করা হয়।

জবানবন্দীর একপর্যায়ে সাক্ষী মুন্নী আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ট্রাইব্যুনালে সেই বিভীষিকাময় লাশের ছবি দাখিল করেন, যা দেখে তার দেবর লাশ শনাক্ত করেছিলেন। ছবিতে দেখা যায়, নজরুলের হাত-পা ও চোখ বাঁধা, মাথায় যমটুপি পরানো এবং পেট কাটা অবস্থায় নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আছে। বীভৎসতায় নজরুলের মুখমণ্ডলও বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।

মুন্নী আক্তার আদালতে দৃঢ়তার সাথে বলেন, র‌্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান আসামি জিয়াউল আহসান তার স্বামীকে গুম করে হত্যা করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দী এবং ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার কারণেই তার স্বামীকে এভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। স্বামীর এই নৃশংস গুম ও খুনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান এই অসহায় নারী।

ফেসবুকে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট, ডিভাইস জব্দ

এ দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে ফেসবুকে আদালত অবমাননাকর পোস্ট দেয়ার অভিযোগে এম এইচ পাটোয়ারী বাবু নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। একই সাথে পোস্টে লাইক, শেয়ার ও অবমাননাকর মন্তব্যকারী ব্যক্তিদেরও গ্রেফতার ও তাদের ডিভাইস জব্দের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। এম এইচ পাটোয়ারী বাবুকে গ্রেফতারে তার বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি পলাতক। তার বাসা থেকে একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত এম এইচ পাটোয়ারী বাবু নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। তার বাসা রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম সেনপাড়ায়।

এম এইচ পাটোয়ারী বাবু নামের ফেসবুক আইডি থেকে দেয়া একটি পোস্টে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ শিশির মনিরের বিরুদ্ধে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ‘খাওয়ার’ অভিযোগ তোলা হয়েছে।

প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা নয়া দিগন্তকে বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির বাসায় অভিযান চালানো হলেও তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। তবে সেখানে স্যামসাং ব্র্যান্ডের একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে, যেটিতে এম এইচ পাটোয়ারী বাবুর ফেসবুক আইডি লগইন অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

প্রসিকিউটর আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি ছড়িয়ে দেয়ার সাথে জড়িত ৫০টি ফেসবুক আইডি শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে।

নানক-তাপসসহ ২৮ আসামির অভিযোগ গঠন শুনানি পেছাল

আরেকটি মামলায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি পিছিয়ে আগামী ১৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় মোট আসামি ২৮ জন। গতাকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ।

এ দিন এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল বুধবার; কিন্তু প্রসিকিউশনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাননি বলে জানান আসামিপক্ষের আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন শাইখ মাহদী। পরে আগামী ১৫ এপ্রিল এ বিষয়ে শুনানির দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান বলেন, ডিফেন্সকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করেনি প্রসিকিউশন। এ কারণে আজ শুনানি হয়নি। আমরা শুধু ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের কপিই পেয়েছি। বাকি ডকুমেন্টসও আমরা প্রসিকিউশনের কাছে চেয়েছি। আশা করি, আগামী তারিখের আগেই আমরা পাবো।

গত ১৫ মার্চ অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির জন্য ৮ এপ্রিল দিন ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলায় উল্লেখযোগ্য আসামির মধ্যে রয়েছেন- সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার ও ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার। এ ছাড়া স্থানীয় কাউন্সিলর, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরও আসামি করা হয়েছে।

বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছেন চারজন। তারা হলেন- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ২৮ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

এ মামলায় আনা তিনটি অভিযোগে প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নৃশংসতা চালায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আসামিদের উসকানি-প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপস্থিতিতে জুলাই আন্দোলনে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। এতে মাহমুদুর রহমান সৈকত, ফারহান ফাইয়াজসহ ৯ জন শহীদ হন। আহত হন আরো অনেকে।