ইদানীং স্কুলগামী শিশুদের হাতে শোভা পায় রকমারি সেলফোন। সাধারণ ফোন থেকে শুরু করে বাহারি স্মার্টফোনও। বাহারি বিচিত্র সব ফোন। দেখা যায়, শিশুটি ঠিকমতো ধরতেই পারছে না ঢাউস আকৃতির ফোনটি। এ যেন জীবনাচারের, প্রাচুর্য্যরে, সামাজিক-মর্যাদার, অহংবোধ প্রকাশের একটি মাধ্যম। অভিভাবকরা তাদের অপত্য স্নেহের প্রকাশ হিসেবে সন্তানদের জন্য অর্থ ব্যয় করতেই পারেন। তবে তা যদি সামাজিক মর্যাদার প্রকাশ হয়ে থাকে তা হলে তারা অজান্তেই স্নেহের পুত্তলির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছেন। শিশুদের হাতে সেলফোন দৃশ্যমান বিশ্বব্যাপী। বৈশ্বিক জীবনাচারে যোগ হওয়া এই পণ্যটি এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রা নিঃসন্দেহে সহজ করেছে। সাথে এর অপব্যবহার এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকিও কিন্তু কম নয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। স্বাস্থ্যঝুঁকির সাথে শিশুদের মানসিক বিকাশের ঝুঁকি তো আছেই। বিশেষ করে পড়াশোনার ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব আজ বৈশ্বিকভাবে শিশুস্বাস্থ্য ও মানসিক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃত।
সম্প্রতি Exploring smartphone using among secondary school students in a rural school in bangladesh নামে এক গবেষণাপত্রে শিক্ষার্থীদের ওপর স্মার্টফোনের প্রভাবের তথ্য ফুটে উঠেছে। মাধ্যমিক স্কুলপড়ুয়া ছাত্রদের ওপর পরিচালিত এ জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রীই এর ব্যবহার করে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে। মাত্র ১৮.৩৩ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এটি শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে- অনলাইন জুয়ায় এর ব্যবহার। ৬১.৬৭ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী স্মার্টফোন দিয়ে অনলাইনে জুয়া খেলে। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে। মাথাব্যথা ও দৃষ্টিশক্তির ত্রুটিতে ভোগে ৪১.৬৭ শতাংশ। খারাপ ফলাফলের জন্য স্মার্টফোনের অবদান ৩৩.৩৩ শতাংশ। অনিদ্রা ও পিঠ বা কোমর ব্যথায় ভোগে ৪৫ শতাংশ। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার হার ৬৩.৩৩ শতাংশ।
করোনাকালীন সময় অনলাইনে শিক্ষা ও দাফতরিক কাজকর্ম করার ব্যবস্থার ফলে করোনা-পরবর্তী সময়েও ছাত্র-ছাত্রীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে পারেনি; এটি এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছে।
সাধারণত পড়াশোনার সময় পড়ার বই এবং চোখের দূরত্ব থাকে গড়ে ৪০ সেন্টিমিটার। ডিজিটাল ডিভাইসের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব কখনো কখনো ১৮-২০ সেন্টিমিটার বা তারও কম দূরত্বে চলে আসে। ফলে শিশুর দৃষ্টি কাছে দেখার উপযোগী হয়ে ওঠে। দিনের বেশির ভাগ সময় ছোট ঘরে কাটানো, বাইরে খেলাধুলা না করার কারণে শিশু-কিশোরদের দৃষ্টিসীমা সঙ্কুচিত হয়ে আসে; দৃষ্টিশক্তি সীমিত হয়ে পড়ে। তারা দূরের জিনিস ভালোভাবে দেখতে পায় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয়ে থাকে ‘মায়োপিয়া’। এর কারণে পরবর্তী জীবনে শিশুটি বিভিন্ন সরকারি চাকরি, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, এমনকি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ঝুঁকিতে পড়ে। মা-বাবার অনেক স্বপ্ন এভাবে হঠাৎ ভাঙনের মুখোমুখি হয়; কিন্তু ফেরার আর উপায় থাকে না। ব্যর্থতার গ্লানিতে জীবন কাটাতে হয় অনেক তীক্ষèধি ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক তথ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। বলা হয়েছে- এর ফলে ২০৫০ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ হবে স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন। শুধু তাই নয়, এরা অধিকাংশই হবে খিটখিটে মেজাজের, অমনোযোগী ও পারিবারিক পরিচিতির সঙ্কুচিত গণ্ডিসম্পন্ন এবং আত্মকেন্দ্রিক।
এই প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ক্ষতিকর দিকগুলো। শোনা যাচ্ছে, সরকার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট এনার্জি সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য আবারো অনলাইন পড়াশোনার কথা ভাবছে; যা হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এ ধরনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে কিশোর-কিশোরী ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার মানের অধঃগতি রোধ করা যাবে না। তাই সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-অভিভাবক সমাজ, শিক্ষকসমাজ- সবাইকে এর বিকল্প ভাবতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা যেন প্রতিভার সুষ্ঠু বিকাশের মাধ্যমে ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক হয়ে উঠতে পারে; যেন কর্মজীবনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ইংরেজি বা অন্য কোনো বিষয়ে শিক্ষার জন্য জনগণের অর্থে বিদেশে যেতে না হয়, এ ব্যাপারে সঠিক পদক্ষেপের বিকল্প নেই।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



