জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ও হামের বিস্তার

ডা: মো: এনামুল হক
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তার অন্যতম সাফল্য ছিল হাম (মিজেলস) নিয়ন্ত্রণ। একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি পাড়ায় যে রোগটি ছিল আতঙ্কের প্রতিশব্দ, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারে তা প্রায় নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে নেমে এসেছিল; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে চিত্র আমরা দেখছি, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৩ দিনে, অর্থাৎ- ১৫ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৫৩৪, নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা : এক হাজার ৯৯ জন। যদি কেবল নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যাই বিবেচনায় নেয়া হয়, তবে এই সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর সাথে আরো উদ্বেগের বিষয় হলো- এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই ১১৮ শিশু সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে, যদিও বেসরকারি হিসাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ২০; কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যে নিশ্চিত মৃত্যু ৬১ জন। আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে এবং মৃত্যুর খবরও প্রতিদিনই আসছে- যা একটি সক্রিয় প্রাদুর্ভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রতি বছর হাম আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা হলেও নিয়মিতভাবে হিসাব করা হয়; কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যাটি ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে না। এর ফলে প্রকৃত মৃত্যুহার অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে যায়। একসময় দেশে হামে মৃত্যুর হার ছিল প্রতি ১০ লাখে ১ শতাংশ; এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে- যা একটি ভয়াবহ উল্লম্ফন। এই পরিবর্তন কেবল পরিসংখ্যানগত নয়, এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও নগ্ন করে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়েছিল দুই হাজার ৪১০ জন। পরবর্তী বছরগুলোতে এই সংখ্যা ৪০০-এর নিচে নেমে আসে, যা টিকাদান কর্মসূচির সফলতার প্রমাণ বহন করে; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারো সংক্রমণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের ৫৬টি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। আরো উদ্বেগজনক হলো- আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু। অথচ জাতীয় লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে হাম ও রুবেলা নির্মূল করা। সেখানে সংক্রমণের হার প্রতি ১০ লাখে ১ শতাংশের নিচে রাখার লক্ষ্য থেকে হঠাৎ করেই তা বেড়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানো আমাদের জন্য গভীর ব্যর্থতার প্রতীক।

প্রশ্ন উঠছে- হঠাৎ করে এই বিস্তার কেন? এর পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, টিকাদান কভারেজে ফাঁক তৈরি হওয়া। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে যে বিঘ্ন ঘটেছিল, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, ফলে একটি ‘সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত একটি ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী’ তৈরি হয়েছে, যেখানে ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, শহর ও গ্রামের মধ্যে টিকাদান বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। তৃতীয়ত, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে টিকা-সংক্রান্ত ভুল ধারণাও ভূমিকা রাখছে। চতুর্থত, উচ্চ জনঘনত্ব ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন সংক্রমণকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করছে।

মৃত্যুহার বৃদ্ধির পেছনেও কয়েকটি কারণ কাজ করছে। অপুষ্টি, বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি, শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে জটিলতা বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে হাসপাতালে আসা, যথাযথ আইসোলেশন না হওয়া এবং সেকেন্ডারি ইনফেকশন যেমন- নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) এসবই মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যেমন- পর্যাপ্ত বেড বা প্রশিক্ষিত জনবল ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী? প্রথমত, ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা প্রয়োজন। মা-বাবা ও পরিবারের দায়িত্ব হলো- শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করা এবং টিকা সম্পর্কে কোনো ধরনের গুজবে কান না দেয়া। টিকাই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়- এটি বারবার জোর দিয়ে বলা দরকার।

চিকিৎসকদের জন্য এই সময়টিতে উচ্চমাত্রার সতর্কতা প্রয়োজন। জ্বর ও র‌্যাশসহ রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত হাম সন্দেহ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও আইসোলেশন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে জটিলতা প্রতিরোধে ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন এবং সহায়ক যত্ন নিশ্চিত করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের করণীয় হলো- রোগ নজরদারি ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা এবং মৃত্যুর তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা। কোথায়, কোন বয়সে, কী কারণে মৃত্যু বেশি হচ্ছে- এই তথ্যগুলো নীতিনির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি ভিত্তিতে ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি চালু করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে টার্গেটেড ইনটারভেশন নেয়া, মাঠপর্যায়ের জনবল ঘাটতি দূর করে যথাযথ জনবলকে উপযুক্ত স্থানে নিয়োগের মাধ্যমে কাজের গতি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সাথে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, সময়মতো টিকা সংগ্রহ না হওয়া বা টিকাদান কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আইনগত জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। সেই সাথে গণমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি প্রতিটি সন্দেহজনক মৃত্যু তদন্তের আওতায় এনে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরো শক্তিশালী করাও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ।

সবশেষে বলা যায়, হাম কোনো নতুন রোগ নয়; এটি প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, যার কার্যকর টিকা বহুদিন ধরেই আমাদের হাতে রয়েছে। তবুও যদি আমরা আবারো এই রোগের কাছে পরাজিত হই, তবে সেটি হবে আমাদের অবহেলা, সমন্বয়ের অভাব এবং পরিকল্পনার ঘাটতির ফল। এখনই সময়, এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে সম্মিলিত উদ্যোগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা- নইলে এর মূল্য দিতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক, কনসালট্যান্ট, ইবনে সিনা, উত্তরা

[email protected]