মুক্তিযুদ্ধে বিদেশীরা : ওডারল্যান্ডের বাইরে আরো ইতিহাস

আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদের নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী তার ‘রাজনীতির তিনকাল’ বইয়ে একটি ইন্টারেস্টিং তথ্য জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় নিয়মিত বাহিনীর ছয় হাজার অফিসার ও সৈনিক নিহত হন। এ ছাড়া পশ্চিম বাংলার প্রাইভেট বাহিনী এমনকি কিছু নকশালীও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে এসে জীবন বিসর্জন দেন।’ তিনি অবশ্য ওই প্রাইভেট বাহিনী সম্পর্কে আর কোনো তথ্য দেননি। তবে তার কথা থেকে এটি বোঝা যায়, ওই বাহিনী ছিল ভারতীয় নাগরিকদের নিয়ে গঠিত বেসামরিক বাহিনী

ওলিউল হক
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও বীরোচিত ভূমিকার জন্য ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক উইলিয়াম অ্যাব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ডকে বীরপ্রতীক পদকে ভূষিত করে। এ কারণে অনেকেই মনে করেন, ওডারল্যান্ডই সম্ভবত একমাত্র বিদেশী নাগরিক যিনি অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। আরো অনেকেই অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং জীবনও বিসর্জন দিয়েছিলেন।

ওডারল্যান্ড ছিলেন ডাচ নাগরিক। পরে তিনি অস্ট্রেলীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। তার মা ছিলেন জার্মান এবং বাবা ডাচ। ১৯৭১ সালে বাটা কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত হন।

এখন দেখা যাক, আর কোন কোন বিদেশী নাগরিক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশীল প্রাসাদ কৈরালাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নেপালি কংগ্রেসের নেতা সুশীল কৈরালা ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ওই সময় নেপাল কংগ্রেসের প্রধান নেতা বিপি কৈরালার সাথে তার দলের আরো নেতাকর্মী ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন। নির্বাসিত নেপালিদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য এই কারণে যে, দালাইলামার সাথে ভারতে নির্বাসিত জীবন যাপনকারী অনেক তিব্বতি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

মক্তিযুদ্ধে নেপালিদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে মুজিবনগর সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থমন্ত্রী এ আর মল্লিক তার একটি বইয়ে উল্লেখ করেন। ‘আমার জীবনকথা ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘পাশের ঘর থেকে এক ভদ্রলোক আসলেন- বিপি কৈরালা, নেপালের এক সময়কার প্রধানমন্ত্রী। তিনি তখন ভারতবর্ষে অবস্থান করতেন। নিজের দেশে থাকতে পারতেন না। তিনি এসে দেখা করলেন। তিনি এসে আমাকে অফার দিলেন, তার অধীনে অনেক গুর্খা আছে যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা রাজি হলেই তিনি তাদের পাঠাতে পারেন। তাদেরকে দেশ থেকে আনতে পারেন। আমি এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি তাকে বললাম, এটি সম্ভব হবে না। আপাতত হবে না এ জন্য যে, আপনি দেশের বাইরে আছেন। আপনার দেশের সরকার এবং আপনার সাথে সম্পর্ক ভালো না। আপনার মহানুভবতায় আমরা অভিভূত বোধ করছি। কিন্তু এই গুর্খা নাগরিক যদি আমাদের সাথে যোগ দেয় তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে অসুবিধা হতে পারে। ভারতীয় সরকারও পড়বে অসুবিধায়। আপনার সরকার এটি করবে না। আমার মনে হয় আপনি অন্যভাবে আমাদের সহায়তা করুন। আমাদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন, আবেদন করেন বিভিন্ন দেশের কাছে। কিন্তু গুর্খ সেনা দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে নামাটা বোধ হয় ঠিক হবে না। তবু আপনাকে আমি এ বিষয়ে পরে জানাব। আমি তো সরকারের কেউ না। আলাপ-আলোচনা করে দেখি। এরপর কলকাতা ফিরে তাজউদ্দিন আহমদকে কথাটি বললাম। তিনি আমাকে সমর্থন করলেন। তিনি বললেন, এটি বোধ হয় হটকারিতা হবে। গুর্খা সেনার দরকার নেই। আমি পরে অমরেশ সেনের মারফৎ নেপালি নেতাকে জানিয়ে দিলাম। (পৃষ্ঠা-১০০)

গুর্খারা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল কি না সে বিষয়ে এ আর মল্লিকের জানা থাকার কথা নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হলেও প্রথমদিকে তা পরিচালিত হতো বিএসএফের তত্ত্বাবধানে। এপ্রিল মাসের শেষে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় দায়িত্ব ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এ ব্যাপারে মুজিবনগর সরকারের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল) এ কে খন্দকার তার ‘১৯৭১ : ঘরে-বাইরে’ বইতে লিখেছেন, ‘আগেই উল্লেখ করেছি যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করত। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের হলে পূর্বাঞ্চল কমান্ড অভিযানের তালিকা তৈরি করত আর আঞ্চলিক পর্যায়ের হলে ভারতীয় সেক্টর সদর দফতর থেকে তা নির্ধারণ হতো। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দফতরে মুক্তিবাহিনীর অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ডিরেক্টর অব অপারেশন্স মেজর জেনারেল বি এন সরকার। লক্ষ্যবস্তুগুলো জেনারেল সরকারের কার্যালয় থেকে ঠিক করা হলেও মাঝে মধ্যে আমাদের সাথে তিনি পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ কিন্তু যুদ্ধের কৌশলগত ছিল না। তিনি আসলে দেশের অভ্যন্তরের কোনো জায়গা বা নদী বা স্থানীয় মানুষজনের মনোভাব সম্পর্কে আমার কাছে জানতে চাইতেন। সেপ্টেম্বর মাসে যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি পেলে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে আমাদের সম্পৃক্ততা কিছুটা বেড়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে মুজিব বাহিনী গঠনের বিষয়টিও উল্লেখ করা যায়। ‘মুজিব বাহিনী’ গঠনের বিষয়ে ভারত সরকার প্রবাসী তাজউদ্দীন সরকারের সাথে কোনো আলোচনা করেনি। এমনকি তাদের কাছে গোটা ব্যাপারটিই গোপন রাখা হয়েছিল। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তার সাথে মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল এবং এসএসএফের দেরাদুনস্থ গোপন ঘাঁটিতে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চীন-ভারত যুদ্ধের পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ওই ঘাঁটিটি তৈরি করে দিয়েছিল।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল (অব:) এস এস উবানের লেখা ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগং’ বই থেকে জানা যায়, তার নেতৃত্বাধীন স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স (এসএফএফ) ১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ভারতীয় মিজো বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে পার্বত্য চট্টগ্রাম শত্রæমুক্ত করেছিল।

এস এস উবান এসএফএফের গঠন সম্পর্কে লিখেন, ‘অক্টোবর ১৯৬২-এর চৈনিক আক্রমণের পর খুব শিগগিরই দুর্গম উত্তরের পাহাড়ের উপজাতিদের মধ্য থেকে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স গড়ে তোলা হয়েছিল। বি এন মল্লিক তার ‘দ্য চাইনিজ বিট্রেয়াল-মাই ইয়ারস উইথ নেহরু’ নামে বইয়ে এই ফোর্সের কথা উল্লেখ করেছেন। মূলত এই সীমান্তজনদের কাজ ছিল চীনারা কখনো আবার ভারতের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে তাহলে তাদের লাইনের পেছনে থেকে গেরিলাযুদ্ধ করে চীনাদের বিরুদ্ধে গোটা লড়াই- এ সাহায্য করা।’

‘তাদের একেবারে স্বাধীনচেতা স্বভাব এবং বেশ ভালোরকম পৌরুষ গর্বের কারণে তারা আরোপিত শৃঙ্খলার বশ হতে চায় না। এটিও অনুভব করা গিয়েছিল যে, তাদেরকে আর্মি বা পুলিশ অ্যাক্টের অধীনে আনলে তাদের স্বাধীন উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগুলোই ভোঁতা হয়ে যাবে, অথচ ওগুলোই দেশপ্রেমিক গেরিলার প্রাণস্বরূপ। সুতরাং সিদ্ধান্ত হয়েছিল এই স্বেচ্ছাসেবক ফোর্সটি একটি সিভিলিয়ান ফোর্স হিসেবে সংগঠিত হয়ে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে কাজ করবে। ওই সময় ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক ছিলেন বি এন মালিক। ঠিক হলো তাদের প্রশিক্ষণের এবং শান্তি ও যুদ্ধকালে তাদের মোতায়েনের ভার অর্পণ করা হবে প্রথা-বহিভর্‚ত মনের এক সৈনিকের ওপর যিনি তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন এবং প্রয়োজনের সময় তাদেরকে লড়াইয়ে নামাতে পারবেন কঠিন আর্মি কোডের সাহায্য ছাড়া, যে কোডে কর্তব্য এড়ানো এবং অবৈধ কর্ম সাধনের বিবিধ অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।’ (পৃষ্ঠা : ৭৬-৭৭)

গুর্খারা মূলত নেপালের নাগরিক। নেপাল সংলগ্ন ভারতের কিছু পার্বত্য এলাকাতেও তারা বসবাস করে। গুর্খারা সৈনিক হিসেবে নির্ভীক ও দুর্ধর্ষ। তাদের অনেকেই ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করে। উইকিপিডিয়ায় দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, এসএসএফের গুর্খা সদস্যরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদের নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী তার ‘রাজনীতির তিনকাল’ বইয়ে একটি ইন্টারেস্টিং তথ্য জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় নিয়মিত বাহিনীর ছয় হাজার অফিসার ও সৈনিক নিহত হন। এ ছাড়া পশ্চিম বাংলার প্রাইভেট বাহিনী এমনকি কিছু নকশালীও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে এসে জীবন বিসর্জন দেন।’

তিনি অবশ্য ওই প্রাইভেট বাহিনী সম্পর্কে আর কোনো তথ্য দেননি। তবে তার কথা থেকে এটি বোঝা যায়, ওই বাহিনী ছিল ভারতীয় নাগরিকদের নিয়ে গঠিত বেসামরিক বাহিনী।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মুক্তিবাহিনীতে বাংলাদেশীদের সাথে সাথে ভারতীয়রাও ছিল। ভারত তাদেরকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক