ইরান যুদ্ধের ধাক্কা বিশ্ব রাজনীতিকে বদলে দিচ্ছে নীরবে

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে সেই পথ ঝুঁকির মুখে পড়তেই তেলের দাম কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় সত্তর ডলার থেকে একশ দশ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

সৈয়দ মূসা রেজা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন বোমার শব্দ ওঠে তখন সেটি শুধু একটি যুদ্ধের খবর নয়। সেটি প্রায়ই ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের শুরু। আজকের ইরান যুদ্ধও সেই রকম এক মুহূর্ত। কোথাও এটি আমেরিকার শক্তির সীমা দেখাচ্ছে। আবার কোথাও এটি ইরানের নতুন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে।

রাশিয়ার ভালদাই ক্লাবের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর তিমোফেই বোরদাচেভ তার নিবন্ধ “ইরান শোজ দ্য ওয়ার্ল্ড দ্য লিমিটস অব ইউএস পাওয়ার” এ লিখেছেন এই সংঘাতকে শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত। নিবন্ধটি প্রকাশ করেছে আরটি ডটকম।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের অভিজ্ঞ পররাষ্ট্র বিশ্লেষক ডেভিড ইগনেশাস তার নিবন্ধ “ইরানস ইসলামিক রিপাবলিক টু পয়েন্ট জিরো ইজ কামিং অ্যান্ড ইট ওয়ান্ট বি প্রিটি” তে লিখছেন এই যুদ্ধ হয়তো দ্রুত শেষ হবে না। বরং এর ভেতর থেকেই জন্ম নিতে পারে এক নতুন ইরান।

দুটি বিশ্লেষণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হলেও এক জায়গায় এসে মিলেছে। এই যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয়। এটি বিশ্ব ব্যবস্থার রূপান্তরের এক অস্থির মুহূর্ত।

তিমোফেই বোরদাচেভ মনে করিয়ে দেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। এখনই বলা যাবে না যে আমেরিকা আর ইসরাইলের অভিযান ব্যর্থ হয়ে গেছে। আবার এটাও বলা যাবে না যে দ্রুত কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সংকট মিটে যাবে। যুদ্ধের ফল এখনও অনিশ্চিত। ইরান রাষ্ট্র কতটা চাপ সহ্য করতে পারে সেটিও পুরোপুরি বোঝা যায়নি।

তবু একটি বিষয় ইতিমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে উঠছে। বিশ্ব আর আগের মতো নেই। এক সময় আমেরিকা প্রায় এককভাবে বিশ্ব রাজনীতির নেতৃত্ব দিত। কিন্তু আজ সেই কাঠামো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

বোরদাচেভ লিখেছেন আমেরিকা বিশ্ব রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে এমন ধারণা অবাস্তব। কিন্তু প্রশ্নটি এখন অন্য জায়গায়। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমেরিকার ভূমিকা কী হবে।

রাশিয়া চীন বা অন্য বড় শক্তিগুলোর কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নতুন বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য নতুন করে গড়ে উঠছে।

রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গভীর। ইতিহাস জুড়ে রাশিয়ার সম্পর্ক ছিল একদিকে ইউরোপের সঙ্গে আবার অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে। কখনও সহযোগিতা কখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তাই ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্য নিয়ে চিন্তা করতে গেলে আমেরিকার জায়গা কোথায় হবে সেটি বোঝা জরুরি।

ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলা সেই প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে একক আধিপত্যের যুগ আর সহজে ফিরে আসবে না।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে সেই পথ ঝুঁকির মুখে পড়তেই তেলের দাম কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় সত্তর ডলার থেকে একশ দশ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

এই অর্থনৈতিক চাপ বিশ্ব রাজনীতির হিসাবকেও বদলে দিচ্ছে। অনেক দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ একটি দীর্ঘ যুদ্ধ মানে শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করতে পারে।

এই কারণেই গোপনে মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে বলে নানা সূত্রে আলোচনা শোনা যাচ্ছে।

বোরদাচেভ একটি অদ্ভুত তুলনা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন বিশ্ব রাজনীতির শরীরে আমেরিকা যেন একটি টিউমারের মতো। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো এখানে সেই টিউমার পুরো শরীর ধ্বংস করে না। বরং পুরো ব্যবস্থার ভেতরেই একটি বিশেষ ভূমিকা নিয়ে টিকে থাকে।

এই অস্বাভাবিক অবস্থান কীভাবে তৈরি হয়েছিল সেটিও তিনি ব্যাখ্যা করেন। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আমেরিকার উত্থান শুধু শক্তির কারণে হয়নি। তখন পশ্চিম ইউরোপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে পড়ে ছিল। চীন ছিল অভ্যন্তরীণ বিপ্লব আর অস্থিরতায়। সোভিয়েত রাশিয়া নিজেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল।

এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসে।

কিন্তু সেটি ছিল না রোমান সাম্রাজ্য বা চেঙ্গিস খানের মতো বিজয়ের গল্প। আমেরিকা অন্য শক্তিগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং অন্যরা ব্যস্ত থাকায় সে সামনে চলে আসে।

বোরদাচেভ এটিকে একটি মরুভূমির কাফেলার উদাহরণ দিয়ে বোঝান। কাফেলার শেষ উটটি হঠাৎ সামনে চলে আসে কারণ বাকিরা পিছিয়ে পড়েছে। আজ সেই ইতিহাস বদলে গেছে।

চীন আবার শক্তিশালী। ভারত দ্রুত উঠছে। রাশিয়া এখনও বড় সামরিক শক্তি। ফলে আমেরিকার একক নেতৃত্বের পেছনে আর সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতি নেই।

ইরান সংকট সেই পরিবর্তনের প্রতীক। এত বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও আমেরিকা সহজে একটি বড় রাষ্ট্রকে দমন করতে পারছে না। পারমাণবিক পর্যায়ে যুদ্ধ না বাড়ালে এমন রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা প্রায় অসম্ভব।

এই জায়গাতেই ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষক ডেভিড ইগনেশাসের লেখা নতুন মাত্রা যোগ করে।

তার মতে যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো শেষ কোথায়। হয়তো যুদ্ধবিরতি হবে। হয়তো বোমা হামলা বন্ধ হবে। হয়তো হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবার তেলবাহী জাহাজ চলবে। কিন্তু তাতে মূল সমস্যা শেষ হবে না।

ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো বিজয় ঘোষণা করবেন। তিনি ইতিমধ্যেই তা করেছেন। কিন্তু সেই বিজয় হতে পারে এমন এক বিজয় যার ফল দীর্ঘ সংঘাত।

ইগনেশাস লিখছেন গত কয়েক দশকের ইতিহাস একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করা যায়। কিন্তু সেটিকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করা খুব কঠিন।

গাজা আফগানিস্তান ইরাক সব জায়গাতেই একই ঘটনা ঘটেছে। প্রতিপক্ষ আবার ফিরে এসেছে।

ইসরাইলের সামরিক কৌশলে একটি কঠোর শব্দ আছে। তারা একে বলে ঘাস কাটা। অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে বারবার দুর্বল করা কিন্তু পুরোপুরি শেষ করতে না পারা। ঘাসের মতো অদম্য। বারবার ছেটে দিলেও আবার গজায়। তাই নিয়মিত ছাটতে হয়।

ইগনেশাসের মতে আমেরিকা এখন একই চক্রে ঢুকে পড়তে পারে। স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধটি আমেরিকার সামরিক শক্তির প্রদর্শন। ইরানের অনেক পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি অস্ত্র কারখানা নৌবাহিনীর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। তবু রাষ্ট্রটি টিকে আছে।

নেতৃত্বের অনেক স্তরের কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কিন্তু তাদের জায়গা নিয়েছে নতুন লোক। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এখনও সক্রিয়।

একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নেও বলা হয়েছে যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালেও ইরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কম। কারণ সেখানে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যবস্থা আগে থেকেই তৈরি। ইগনেশাস বলছেন সামনে তৈরি হতে পারে ইসলামিক রিপাবলিক টু পয়েন্ট জিরো।

এটি হবে আরও সামরিকীকৃত একটি রাষ্ট্র। যেখানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর রাজনীতি অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।

এর একটি ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। সাম্প্রতিক হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে এই সিদ্ধান্তে আইআরজিসির প্রভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। ইগনেশাস মনে করেন, ইরানের এই স্থিতিশীলতার একটি গভীর কারণ আছে।যখন একটি জাতি মনে করে তার হারানোর কিছু নেই তখন সে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়।

এই মনস্তত্ত্ব ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধেও একই প্রশ্ন উঠেছিল কেন ভিয়েতকং এত বড় শক্তির সামনে আত্মসমর্পণ করছে না।

ইরানেও একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দেশটির নেতৃত্ব বলছে, তারা লড়াই চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না পশ্চিমা শক্তি বুঝতে পারে ইরানের ওপর হামলা করা সহজ বিষয় নয়।এই সংঘাতের আরেকটি বিপজ্জনক দিক রয়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে নতুন ধরনের সন্ত্রাসবাদ জন্ম নিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এমন উদাহরণ আগেও রয়েছে। একসময় জর্ডানে পরাজয়ের পর প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর নামে একটি গোপন গেরিলা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল।অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ইরান চাইলেই তার থেকেও শক্তিশালী গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে।

যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। তেলের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার অস্থির হয়েছে। বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতেও ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘ যুদ্ধ হলে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে।

এদিকে, যুদ্ধের ময়দানে একটি বাস্তব প্রশ্নও সামনে এসেছে। আমেরিকা কতদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।বিশ্লেষকদের মতে দীর্ঘ যুদ্ধ চালালে অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে অন্য অঞ্চল যেমন ইউক্রেন বা ইন্দো প্যাসিফিকেও সামরিক ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে।

এই সব বাস্তবতা মিলিয়ে তিমোফেই বোরদাচেভ একটি বড় উপসংহার টানেন।ইরান যুদ্ধ হয়তো বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

যদি এই রূপান্তর বড় কোনো বিপর্যয় ছাড়াই সম্পন্ন হয় তবে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হবে আরও বহুমুখী।

সেখানে আমেরিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু একক নেতা হিসেবে নয়। বরং অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে এক জটিল ভারসাম্যের অংশ হিসেবে।

এই পরিবর্তনটি হয়তো ধীরে ধীরে ঘটবে। যুদ্ধ, সঙ্কট, অর্থনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে।কিন্তু ইতিহাসের বড় মোড়গুলো প্রায়ই এমনভাবেই আসে। বোমার শব্দের আড়ালে।

লেখক : সাংবাদিক