ইসলামী ব্যাংক খাতে অস্থিরতার শঙ্কা

আস্থা-সুশাসন রক্ষা জরুরি

তবে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো— ইসলামী ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত রাখা। পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ঋণ অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি নেয়া। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সক্রিয় নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন অডিট ও তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশের ইসলামী ব্যাংক খাত ফের এক অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্থিতি ফিরে পেয়েছিল এ খাত। কিন্তু অতীতের বিতর্কিত অভিজ্ঞতা, বিশেষত একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংক দখল, ঋণ অনিয়ম এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগ— এসবের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাজারে গুঞ্জন, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং আমানতের সামান্য হলেও পতন— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। অথচ যেখানে সামান্য আস্থার ঘাটতি বড় ধরনের ঝুঁকির জন্ম দিতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকব্যবস্থা, মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অতীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় একের পর এক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসা বিপুল অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার তথ্য কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। এমন বাস্তবতায় যদি আবারো একই ধরনের গোষ্ঠীর পুনঃপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে তা কেবল একটি ব্যাংক নয়; পুরো খাতের ওপর আস্থার ভিত্তি নড়বড়ে করে দিতে পারে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ যে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে গ্রাহকদের আস্থা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস প্রচেষ্টা। সঙ্কটকালে কর্মীরা সেবার মানোন্নয়ন, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং গ্রাহক সংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এ অর্জন অত্যন্ত নাজুক; বাহ্যিক প্রভাব বা রাজনৈতিক-করপোরেট চাপ যদি আবার সক্রিয় হয়, তবে এ অগ্রগতি সহজে ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে।

ব্যাংক খাতে আস্থার সামান্য ঘাটতিও দ্রুত আমানত প্রত্যাহারের ঢেউ তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন সেই প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। একই সাথে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের হ্রাস এবং বিনিয়োগের সামান্য কমে যাওয়া খাতটির সামগ্রিক চাপের দিকটিও তুলে ধরে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির কিছু ইতিবাচক সূচক আছে, তবে স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা উপেক্ষার সুযোগ নেই।

এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন প্রয়োজন দৃঢ় এবং স্বচ্ছ অবস্থান। ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকলে তা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। শুধু কাঠামোগত সংস্কার নয়, বাস্তবায়নেও কঠোরতা প্রয়োজন। একই সাথে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে গ্রাহকদের আস্থা অক্ষুণ্ন থাকে। তারা নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তায় না ভোগেন।

তবে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো— ইসলামী ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত রাখা। পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ঋণ অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি নেয়া। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সক্রিয় নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন অডিট ও তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোনো গুঞ্জন বা অনিশ্চয়তার বিষয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে হবে; যাতে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক ছড়াতে না পারে। একই সাথে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন জোরদার, দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। কারণ, শেষ পর্যন্ত ব্যাংক টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাসে; বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা কঠিন বৈকি।