হাম-সংক্রমণের কারণ রাষ্ট্রীয় গাফিলতি, অবিলম্বে টিকাদান শুরু করুন

বর্তমান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। দ্রুত টিকা দেয়ার ব্যবস্থা, সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো দরকার। ভবিষ্যতের জন্য স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কারো গাফিলতির কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকিতে না পড়ে।

দেশজুড়ে হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। হাম সাধারণত শিশুদের হয়। এ রোগে আক্রান্তদের প্রথমে জ্বর হয়। জ্বর তীব্র হতে থাকে। এরপর মুখমণ্ডলে ও পরে সারা শরীরে র‌্যাশ উঠতে থাকে। রোগটি খুব ছোঁয়াচে। সম্প্রতি রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় হামে অন্তত ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

গত জানুয়ারি থেকে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে শত শত শিশু। যথাযথ প্রস্তুতি না থাকায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একই সাথে অন্যান্য সংক্রামক রোগ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বছরের এ সময়ে বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মতো বিভিন্ন ধারাবাহিক উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের কারণে গুটিবসন্ত নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। এখনো প্রতি বছর কিছু মানুষ জলবসন্তে আক্রান্ত হয়। তবে এ রোগ প্রাণঘাতী নয়। কোথাও পোলিও রোগও ফিরে আসছে। এর কারণ টিকাদানের মতো কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা না করা। বিশেষ করে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের ১৫ বছরে উপর্যুপরি কয়েক দফায় সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়নি। হামের সংক্রমণ হওয়ার পর জানা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হামের টিকার মজুদ নেই। গণমাধ্যমের খবর, কেন্দ্রীয় গুদামে শুধু হামের টিকার মজুদ শূন্য তাই নয়, ১০টি রোগের টিকার কোনো মজুদ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীলতা এতে স্পষ্ট। এই দৃষ্টান্ত ভয়াবহ বললে কম বলা হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন হামের টিকা সংগ্রহের তোড়জোড় চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আট বছর আগে হামের টিকা দেয়া হয়েছিল। এরপর আর হয়নি। অথচ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দফতরের গাফিলতিতে একটি সফল কর্মসূচি বরবাদ হতে বসেছে।

সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে দেশে ১২টি রোগ প্রতিরোধে ৯টি টিকা দেয়া হয়। বিভিন্ন বয়সী শিশুদের দেয়া হয় সাতটি টিকা। নিয়মিত হামের টিকা দেয়ার পাশাপাশি চার বছর পরপর দেশজুড়ে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়। গ্রামগঞ্জে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিয়মিত শিশুদের টিকা দেন। কিন্তু ২০২০ ও ২০২৪ সালে পরপর দুই দফায় আওয়ামী সরকার দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি পালন করেনি। এর আগেও এ ধরনের কর্মসূচি পালন করে একান্ত দায়সারাভাবে। কাগজে-কলমে হিসাব দেখানোর প্রবণতা ছিল মুখ্য। তার পরিণামে আজ হামের এই বিপজ্জনক সংক্রমণ। এখন ৯ মাসের কম বয়সী শিশুও আক্রান্ত হচ্ছে।

বর্তমান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। দ্রুত টিকা দেয়ার ব্যবস্থা, সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো দরকার। ভবিষ্যতের জন্য স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কারো গাফিলতির কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকিতে না পড়ে।