দ্বন্দ্ব, সঙ্ঘাত ও যুদ্ধ যেন পৃথিবীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্বলের উপর সবলের আঘাত নিত্য চলমান। শক্তিমানরা পৃথিবীতে নিজেদের আভিজাত্য টিকিয়ে রাখতে ও দাপট দেখাতে সদা তৎপর। এতে কত মানুষ মারা গেল, আর কত জনপদ ধ্বংস হলো— তা দেখার ফুরসত নেই।
নিকট অতীতে পৃথিবী কখনোই শান্ত ছিল না। চালাক, বুদ্ধিমান ও ক্ষমতাবানরা যখন নিজেদের আরো উন্নতি ও সুখ-শান্তির আশায় অন্যের উপর প্রভুত্ব চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, অন্যের সম্পদ ও সম্পত্তি দখলের জন্য মরিয়া হয়েছে— তখনই পৃথিবীর নানা প্রান্তে অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। রক্ত ঝরেছে লাখ লাখ বনি আদমের। বাস্তুচ্যুত কিংবা পৃথিবী থেকে অকালেই বিদায় নিয়েছে অসংখ্য মানুষ। ধ্বংস হয়েছে জনপদ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্রগুলোর মদদে মধ্যপ্রাচ্যে চোখের সামনে ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষদের প্রতিনিয়ত হত্যা ও তাদের সম্পত্তি দখল করছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় এগিয়ে আসার প্রধান নৈতিক দায়িত্ব ছিল উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর। কিন্তু তারা এগিয়ে আসেনি।
অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই এখন বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী ক্ষমতা ব্যবহারের কোনো সীমা আছে কি-না, চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘হ্যাঁ, একটি জিনিস আছে। আমার নিজের নৈতিকতা, আমার নিজস্ব চিন্তা। এটিই একমাত্র জিনিস যা আমাকে থামাতে পারে।’ ট্রাম্প তখন আরো বলেছেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের দরকার নেই। আমি কারো ক্ষতি করতে চাই না।’
তাহলে প্রশ্ন ওঠে— স্বাধীন দেশ ভেনিজুয়েলায় নিরাপত্তারক্ষীদের হত্যা করে দেশটির প্রেসিডেন্ট দম্পতিকে তার বাসা থেকে ফিল্মি স্টাইলে তুলে নিয়ে যাওয়া, ইরানে হামলা করে দেশটির শীর্ষ নেতারাসহ স্কুলের শিশুদের হত্যা করাও কি ট্রাম্পের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে? এসব কি ট্রাম্পের কাছে কোনো ক্ষতি নয়?
ট্রাম্পের এমন নৈতিকতার নামে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের শিকার যে, আগামীতে আরো অনেক দেশই হতে পারে, তা বললে অত্যুক্তি হবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরানের এসব মানববিধ্বংসী কর্মকাণ্ড আর এক মুহূর্তও চলতে দেয়ার সুযোগ নেই।
আজকে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও ইউরোপে জীবনযাত্রায় ব্যাপক আঘাত আসছে বিধায় এসব অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধানরা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সহযোগী হতে চাচ্ছেন না। কিন্তু এই রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের উপর আঘাত আসার আগেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সন্ত্রাস ও মাস্তানির বিরুদ্ধে কথা বলত, তাহলে তারা আজকের এ অবস্থায় এসে উপনীত হতো না।
বিশ্ব আজ যে বিপজ্জনক খেলার মুখোমুখি, তা থামাতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য যে জাতিসঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল, তা কিছু রাষ্ট্রের পুতুল হিসেবে কাজ করছে। এখন সময় এসেছে জাতিসঙ্ঘকে মুষ্টিমেয় কিছু রাষ্ট্রের হাত থেকে রক্ষা করে সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্বের সব রাষ্ট্রের মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর। এ জন্য জাতিসঙ্ঘের পুনর্গঠন দরকার।
বিশ্বের আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকেও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এসব সংস্থার নিজস্ব শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার ।
পৃথিবীতে চলমান রক্তের হোলিখেলা এখনই বন্ধ করতে হবে। আর একটি জনপদও যাতে ধ্বংস না হয়, সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সুশৃঙ্খল বিশ্বব্যবস্থা ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দেশে দেশে জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।



