- খাদিজা পারভীন
বিশ্বকাপ মানেই নব্বই মিনিটের টানটান উত্তেজনা, গ্যালারির গর্জন, খেলোয়াড়দের ঘাম আর কোটি মানুষের আবেগ। কিন্তু ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথমবারের মতো যুক্ত হলো সুপার বোল-ধাঁচের হাফটাইম শো। এই নতুন উদ্যোগ একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে বিনোদনপ্রেমীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের মনে প্রশ্ন তুলেছে—ফিফা কি ধীরে ধীরে ফুটবলকে ছাপিয়ে বাণিজ্যিক বিনোদনের পথে হাঁটছে?
প্রায় এক শতাব্দীর বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে কখনো ফাইনালে হাফটাইম শো ছিল না। ২০২৬ সালের আসরে প্রথমবারের মতো বিশ্বের জনপ্রিয় শিল্পীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য সংগীতানুষ্ঠান। ফিফার ভাষ্য, এটি শুধু বিনোদন নয়; বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং নতুন দর্শক আকৃষ্ট করারও একটি প্রচেষ্টা।
বর্তমান ক্রীড়াবিশ্বে টেলিভিশন স্বত্ব, স্পনসরশিপ, বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল সম্প্রচারই সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। সুপার বোলের হাফটাইম শো বহু বছর ধরেই বিজ্ঞাপন ও বিনোদনের বিশাল বাজার তৈরি করেছে। সেই সফল মডেল থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ফিফাও বিশ্বকাপ ফাইনালকে একটি বৈশ্বিক বিনোদন উৎসবে রূপ দিতে চেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটবল এখন শুধু একটি খেলা নয়; এটি বহু বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক শিল্প। ফলে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখাও বড় ব্যবসায়িক কৌশল হয়ে উঠেছে।
ফুটবলের ইতিহাস দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। একসময় এটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের বিনোদন। ইংল্যান্ডের কারখানার শ্রমিকেরা সপ্তাহান্তে মাঠে নেমে খেলতেন। ধীরে ধীরে সেই খেলাই পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হয়।
কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় এর অর্থনৈতিক চরিত্রও।
আজকের ফুটবল আর শুধু মাঠের খেলা নয়; এটি একটি গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রি।
বিশ্বকাপ আয়োজন মানে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়—এটি হাজার হাজার কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট, পর্যটন, মার্চেন্ডাইজ, ডিজিটাল কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইসেন্সিং—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ক্রীড়া আসরগুলোর একটি।
ফিফার ২০২৩ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংস্থাটির আয়ের প্রধান উৎস সম্প্রচারস্বত্ব ও বিপণন। বিশ্বকাপ যত বড় হবে, আয়ের সুযোগও তত বাড়বে। সেই কারণেই ফিফা এখন ম্যাচের বাইরের প্রতিটি মুহূর্তকেও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে। হাফটাইম শো সেই পরিকল্পনারই একটি অংশ।
ফুটবলে হাফটাইম চালু করা হয়েছিল সম্পূর্ণ কৌশলগত কারণে। খেলোয়াড়দের বিশ্রাম, চিকিৎসা, পানি পান এবং কোচের নির্দেশনা দেওয়ার জন্যই ১৫ মিনিটের বিরতি নির্ধারণ করা হয়। এই সময় মাঠে কোনো অনুষ্ঠান হতো না। কোচের ড্রেসিংরুমই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।সেখানে বদলে যেত ম্যাচের ভাগ্য।অসংখ্য বিশ্বকাপ ফাইনালে দ্বিতীয়ার্ধের প্রত্যাবর্তনের গল্প শুরু হয়েছে এই হাফটাইম থেকেই।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতি ছিল ভিন্ন। আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল কিংবা বেসবলে দর্শককে কেবল খেলা দেখানো হয় না; তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদন অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়। সেই সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই জন্ম নেয় হাফটাইম শো।
১৯৬৭ সালে প্রথম সুপার বোলের হাফটাইমে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্চিং ব্যান্ড। এরপর বহু বছর ধরে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই ছিল প্রধান আকর্ষণ।
কিন্তু ১৯৯৩ সালে ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড়। ১৯৯৩ সালের সুপার বোল। মাঠে নামলেন মাইকেল জ্যাকসন।মাত্র কয়েক মিনিটের পারফরম্যান্স বদলে দিল পুরো ক্রীড়া বিনোদনের ধারণা।খেলার চেয়ে বেশি আলোচনা হতে লাগল হাফটাইম শো নিয়ে।
টেলিভিশনের দর্শকসংখ্যা বেড়ে গেল।বিজ্ঞাপনদাতারা বুঝে গেলেন—এই কয়েক মিনিটের মূল্যও ৯০ মিনিটের খেলার সমান, কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি। সেই দিন থেকেই হাফটাইম আর শুধুই বিরতির অনুষ্ঠান রইল না।
এটি পরিণত হলো একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে। আধুনিক বিশ্বে ১৫ মিনিট আর শুধু ১৫ মিনিট নয়।
এই ১৫ মিনিটের অর্থ এখন কোটি কোটি ডলার। এই সময়টুকুকে ঘিরেই তৈরি হচ্ছে নতুন ব্যবসা, নতুন বিপণন কৌশল, নতুন বিনোদন শিল্প এবং নতুন বিতর্ক।
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা, যে সংস্থা একসময় খেলার ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলত, তারাই এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে আনছে হাফটাইম শো। যুক্তরাষ্ট্রের সুপার বোলের আদলে গড়ে ওঠা এই আয়োজন কেবল সংগীত পরিবেশনা নয়; এটি ফুটবলের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
ফিফার আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সম্প্রচার ও বিপণন আয় তাদের রাজস্বের সবচেয়ে বড় অংশ। ফলে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আজ সুপার বোলের হাফটাইম শো নিজেই একটি বৈশ্বিক ইভেন্ট।
ফুটবলের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো। এই খেলার জনপ্রিয়তার মূল শক্তি ছিল তার সরলতা, আবেগ ও প্রতিযোগিতা। কিন্তু আধুনিক যুগে খেলাধুলা আর কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পের অংশ।
হাফটাইম শো সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক। একদিকে এটি নতুন দর্শক, নতুন স্পন্সর ও নতুন আয়ের পথ খুলে দিচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক সমর্থকের আশঙ্কা—অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ ফুটবলের ঐতিহ্য, ছন্দ ও স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাণিজ্য ছাড়া আধুনিক ক্রীড়া টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু বাণিজ্যেরও একটি সীমা থাকা দরকার। যদি বিনোদন খেলাকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে বিশ্বকাপ তার ঐতিহ্যগত পরিচয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।



