এমি মার্টিনেজের ঐতিহাসিক একক সংগ্রাম

আজ বিশ্বজয়ী গোলরক্ষক হিসেবে যার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়, এক দশক আগেও ফুটবলাঙ্গনে তিনি ছিলেন প্রায় অচেনা এক মুখ।

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল
  • ফারজানা খাতুন

ফুটবলের সবুজ গালিচায় সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সমস্ত আলো সাধারণত কেড়ে নেন ফরোয়ার্ড আর গোলদাতারা। গোলপোস্টের নিচে বিষণ্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির একাগ্রতা কিংবা লড়াই অধিকাংশ সময়ই ঢেকে যায় নেপথ্যের অন্ধকারে। কিন্তু সেই অন্ধকার ভেদ করে নিজের আত্মত্যাগ, জেদ আর অদম্য সাহসের শক্তিতে যিনি নিজেকে ফুটবলের ইতিহাসে অমর করে নিয়েছেন, তিনি এমিলিয়ানো এমি মার্টিনেজ তার এই পথচলা কোনো রূপকথা নয়; এটি এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধার দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক এক একক সংগ্রাম।

অন্ধকারের দীর্ঘ প্রহর

আজ বিশ্বজয়ী গোলরক্ষক হিসেবে যার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়, এক দশক আগেও ফুটবলাঙ্গনে তিনি ছিলেন প্রায় অচেনা এক মুখ। তরুণ বয়সে আর্জেন্টিনার দরিদ্র পরিবার আর মা-বাবাকে আর্থিক কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে দেশ ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন ইংলিশ ক্লাইম্ব ‘আর্সেনাল’-এ। কিন্তু আর্সেনালে তার ভাগ্যে জুটেনি নিয়মিত খেলার সুযোগ। বছর পর বছর কেটেছে একের পর এক ক্লাবে ধারে (Loan) খেলে আর রিজার্ভ বেঞ্চে বসে।

এক ক্লাব থেকে অন্য ক্লাবে ঘুরে বেড়ানো, বেঞ্চে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রহর গোনা—যেকোনো ফুটবলারের মন ভেঙে দেওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এমি মার্টিনেজ হাল ছাড়েননি। যখন সবাই তাকে ভুলে গিয়েছিল, তখনও গোলপোস্টের পেছনে নিঃশব্দে ঘাম ঝরিয়ে গেছেন তিনি, অপেক্ষা করেছেন নিজের সঠিক সময়টির জন্য।

অপেক্ষার অবসান ও ধূমকেতুর মতো উত্থান

২০২০ সাল; দীর্ঘ ১০ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে খুলে যায় বন্ধ দরজা। আর্সেনালের মূল গোলরক্ষক বার্নার্ড লেনো চোট পেলে সুযোগ আসে মার্টিনেজের সামনে। পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়ে দেন এতদিন বিশ্ব কী মিস করছিল! আর্সেনালকে এফএ কাপ ও কমিউনিটি শিল্ড জেতাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি।

তবে এমির স্বপ্নের পরিধি কেবল ক্লাব ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার আসল লক্ষ্য ছিল আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে তোলা। সেই সুযোগ যখন এলো, তিনি আর পেছন ফিরে তাকাননি।

জাতীয় দলের ত্রাণকর্তা ও 'পেনাল্টি মাস্টার'

জাতীয় দলে ঈর্ষণীয় সাফল্য ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারজাতীয় দল আর্জেন্টিনার হয়ে এমি মার্টিনেজের অর্জন রূপকথার মতো।

লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা দল যখন বছরের পর বছর একটি আন্তর্জাতিক ট্রফির জন্য হাহাকার করছিল, তখন সেই বরফ ভাঙার কারিগর হয়ে আসেন এমি। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায় সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে তার সেই ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স কিংবা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ফুটবলপ্রেমীরা কোনোদিন ভুলবে না।

কিন্তু তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মহাকাব্যিক অধ্যায় লেখা হয় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে:

ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল: নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ৩-৩ সমতায় থাকার পর, ১২৩তম মিনিটে র‌্যান্ডাল কোলো মুয়ানির সেই নিশ্চিত গোল বাঁচানো শটটি ফুটবলের ইতিহাসেই সর্বকালের সেরা সেভগুলোর একটি।

ট্রাইব্রেকারে প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব গুঁড়িয়ে দিয়ে বল ঠেকিয়ে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা তাকে এনে দেয় বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষকের সম্মান 'গোল্ডেন গ্লাভস'।

ব্যক্তিগত ট্রফি: তিনি কাতার বিশ্বকাপ (২০২২), ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা—তিনটি টুর্নামেন্টেই সেরা গোলরক্ষক হিসেবে গোল্ডেন গ্লাভস পুরস্কার জিতেন। এছাড়া ফিফা বেস্ট গোলরক্ষক (২০২২, ২০২৪) এবং রেকর্ড দুইবার ইয়াশিন ট্রফি (২০২৩, ২০২৪) লাভ করেন।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে স্পেন যখন একের পর এক ধারালো আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণে তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন পুরো একটি দেশের স্বপ্নকে একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘদেহী

ট্রফি হয়তো ডিফেন্ড করা হয়নি, ট্র্যাজেডির শেষ দৃশ্য হয়তো স্পেনের ১-০ গোলের জয়ে শেষ হয়েছে; কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়ামে 'ডিবু' মার্টিনেজ যে নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের গল্প লিখে গেলেন, তা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা একক পারফর্ম্যান্স হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

ফাইনালের এই অলৌকিক পারফর্ম্যান্সের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক চরম আত্মত্যাগের কাহিনী। গত মে মাস থেকেই ডান হাতের ভাঙা আঙুলের ইনজুরি বয়ে বেড়াচ্ছিলেন মার্টিনেজ । দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার তাগিদে অস্ত্রোপচার না করিয়ে যন্ত্রণানাশক ইনজেকশন নিয়ে টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি।

অবসর বিতর্ক: ২০২৬ বিশ্বকাপের রানার্সআপ হওয়ার পর, তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফাইনালে হারের তীব্র কষ্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন এই তারকা।

ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন লিওনেল মেসি সহ আলবিসেলেস্তে ফুটবলাররা। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি ও অবসরের ইঙ্গিত দিয়ে একটি আবেগঘন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোস্ট করেন ৩৩ বছর বয়সী এই তারকা।

"আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা আবার জিতব। স্বপ্ন দেখেছিলাম শিরোপাটা আর্জেন্টিনায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে আবারও নতুন ইতিহাস লেখার। কিন্তু এই কষ্টের ভাষা প্রকাশ করার মতো শব্দ আমার জানা নেই। অনেক কিছু নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে, হয়তো এবার সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে। আমি সত্যি দুঃখিত, আমি আমার দেশ ও সতীর্থদের জন্য আমার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছিলাম।"

— এমিলিয়ানো মার্টিনেজ

"অনেকে সুযোগ পেয়ে গল্প তৈরি করে, আর কিছু মানুষ বছরের পর বছর নীরব লড়াই চালিয়ে সুযোগটা নিজের ছিনে নেয়।" — এমি মার্টিনেজের ক্যারিয়ার যেন এই কথারই বাস্তব রূপ।

এক অনুপ্রেরণার নাম

এমি মার্টিনেজের এই গল্প কেবল ফুটবল মাঠের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের গল্প। যেখানে বছরের পর বছর ব্যর্থতা আর অবহেলা পেয়েও একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে বিশ্বমঞ্চের সেরা পদে উন্নীত করতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ তিনি।

তার লড়াই প্রমাণ করে, সুযোগ পেতে দেরি হতে পারে, পথটা একাকী এবং কঠিন হতে পারে—কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস আর সততা থাকলে ইতিহাস তৈরি করা অসম্ভব নয়। ফুটবল বিশ্ব এমি মার্টিনেজকে সবসময় মনে রাখবে একজন 'ঐতিহাসিক একক সংগ্রামী' যোদ্ধা হিসেবে।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।