তারকাখচিত অনুষ্ঠানে বিশ্বকাপ ফাইনাল : আর্জেন্টিনা কি চাপে থাকবে?

১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এবার মেসির সামনে সেই ইতিহাস গড়ার সুযোগ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

নিউইয়র্কে শুক্রবার রাতে ফ্যানাটিকস ফেস্টের মঞ্চে একসাথে উপস্থিত হওয়া কিংবদন্তিদের তালিকা ছিল অবিশ্বাস্য। ছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা সুপার বোলজয়ী টম ব্র্যাডি, টেনিসে সর্বাধিক গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী নোভাক জোকোভিচ এবং পুরুষদের বাস্কেটবলে ইতিহাসের একমাত্র চারবারের অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী কেভিন ডুরান্ট।

অনুষ্ঠান শেষে তারা সবাই একটি সেলফি তুলেন লিওনেল মেসির সাথে।

এটাই যেন মেসির প্রভাবের সর্বোচ্চ প্রমাণ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় ক্রীড়া তারকারাও সর্বকালের সেরা ফুটবলারের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ উপভোগ করেন। রোববার বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য দেড় শ’ কোটি দর্শকের সাথে তারাও বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা-স্পেনের ম্যাচ উপভোগ করবেন।

মেসি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বস্ব উজাড় করে দেব।’

ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য রোববারের ফাইনালের আগে এটিই ছিল মেসির শেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি হওয়ার ঘটনা। ফিফা এবার ফাইনাল-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনের জন্য বেছে নিয়েছিল ফ্যানাটিকস ফেস্ট- নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত চার দিনের একটি ক্রীড়া উৎসব, যেখানে অটোগ্রাফ সেশন ও তারকাদের উপস্থিতির আয়োজন ছিল। এর ফলে শত শত দর্শক এমন এক পরিবেশে মেসিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান, যা সাধারণত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে না।

স্পেন অধিনায়ক রদ্রি বলেন, ‘একজন খেলোয়াড় হিসেবে এবং আর্জেন্টিনার জন্য মেসির গুরুত্ব ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমার কাছে তিনি নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা।’

সাংবাদিকদের বদলে এখানে কাল কিংবদন্তিদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মেসি, স্কালোনিরা।

এই বিশেষ অনুষ্ঠানের ধারণাটি ছিল ব্যতিক্রমী। প্রচলিত সংবাদ সম্মেলনের মতো সাংবাদিকদের প্রশ্নের বদলে প্রশ্ন করেন বিশ্বের খ্যাতিমান ক্রীড়াতারকারা।

নোভাক জোকোভিচ প্রথমে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে চাপ সামলানোর উপায় নিয়ে প্রশ্ন করেন। এরপর একই ধরনের প্রশ্ন করেন মেসিকেও।

মেসির উত্তর শেষে জোকোভিচ হাসিমুখে বলেন, ‘গ্রাসিয়াস, লিও।’(ধন্যবাদ লিও)।

এরপর তিনি স্পেনের কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে ও অধিনায়ক রদ্রিকে বড় ম্যাচে কিভাবে শান্ত থাকা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন করেন।

টম ব্র্যাডি মেসিকে লামিন ইয়ামালের সাথে ভাইরাল হওয়া সেই বিখ্যাত ছবির প্রসঙ্গ তোলেন এবং রদ্রিকে জিজ্ঞেস করেন, ফাইনালের আগে সতীর্থদের কী বলবেন?

পরে কেভিন ডুরান্ট আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে প্রশ্ন করেন, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারলে তার কাছে এর অর্থ কী হবে?

আর্জেন্টিনা ও স্পেন, দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচদেরই পুরো আয়োজন উপভোগ করতে দেখা যায়। বিশ্বকাপ ফাইনাল যেমন এক মহা আয়োজন, তেমনি ছিল এই ফাইনাল-পূর্ব অনুষ্ঠানও।

ফাইনালের চাপ নিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘এটা আর একটি ম্যাচ মাত্র। এটা বিশ্বকাপ ফাইনাল। এই বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত ভাবার সুযোগ নেই।’

তবে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে এখনো অপরাজিত (৭ জয়), অন্যদিকে স্পেনের একমাত্র পয়েন্ট খোয়া যায় উদ্বোধনী ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করে (৬ জয়, ১ ড্র)।

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়ে দুর্দান্ত জয় পায় আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধান থেকে ফিরে জয় পায় তারা। এ ছাড়া শেষ ৩২-এ কেপ ভার্দে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত খেলতে হয়েছে তাদের।

মেসি বলেন, ‘আমি বহুবার বলেছি, আমরা কখনোই লড়াই থামাই না।’

এই জয়ের ধারাবাহিকতাই আর্জেন্টিনাকে নিউইয়র্কে নিয়ে এসেছে। শুক্রবার মেসি মঞ্চে ওঠার সময় দর্শকদের অনেকেই হাততালি দিতে পারেননি, কারণ তাদের প্রায় সবার হাতেই ছিল মোবাইল ফোন, সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করার জন্য।

মেসি বুঝতে পেরেছিলেন দর্শকেরা কী চান। তিনি হাসলেন, হাত নাড়লেন। আর পুরো হল উল্লাসে ফেটে পড়লো।

অনুষ্ঠান শেষে খেলোয়াড়, কোচ, অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী কেভিন হার্ট, র‌্যাপার ও সঙ্গীত প্রযোজক ট্র্যাভিস স্কট, ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা রিও ফার্দিনান্দ, ফ্যানাটিকসের প্রধান নির্বাহী মাইকেল রুবিনসহ সবাই দর্শকদের পেছনে রেখে একটি স্মরণীয় সেলফিতে অংশ নেন।

স্কালোনি বলেন, ‘রোববার দারুণ একটি প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে।’

অনুষ্ঠান শেষে বেরিয়ে যাওয়ার আগে মেসি যেন একবার বিশ্বকাপ ট্রফিটি রাখা কাচের বাক্সটির দিকেও তাকিয়েছিলেন। অবশ্য তাকে মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই, কী ঝুঁকি ও কী ইতিহাস অপেক্ষা করছে।

১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এবার মেসির সামনে সেই ইতিহাস গড়ার সুযোগ।

গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড় ও কোচদের এই দলটি প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করছে, যাতে আমাদের দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পারি। মেসিকে সাথে নিয়ে, আমাদের এই দলকে নিয়ে আমরা সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেব, যাতে বিশ্বকাপটি আবার আমাদের দেশে নিয়ে যেতে পারি এবং দেশের মানুষের সাথে উদযাপন করতে পারি।’