বয়স যেন স্পর্শ করতে পারছে না লিওনেল মেসিকে। ৩৮ বছর বয়সে এসেও যেন গোলের ক্ষুধা একটুও কমেনি। যার প্রমাণ দেখা গেল আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেও যেন ক্ষুধার্ত তিনি।
বিখ্যাত মেট লাইফ স্টেডিয়ামে বুধবার দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনাকে ৩-০ ব্যবধানে জেতানোর পাশাপাশি বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখলেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। ছুটছেন যেন অমরত্বের পথে।
এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক আর সেই হ্যাটট্রিকেই তিনি ছুঁয়ে ফেলেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড। দু’জনের বিশ্বকাপ গোল সংখ্যা এখন সমান।
গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচে আর মাত্র একটি গোল করলেই এককভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসবেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মহাতারকা।
শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় গোলটি করার মধ্য দিয়ে মেসি স্পর্শ করেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনাল্ডো নাজারিওর বিশ্বকাপ গোলসংখ্যাও। তবে তাতে খুশিই তিনি। সেই সাথে মেসির উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করেছেন।
ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির মতে, সর্বকালের সেরা ফুটবলার নিয়ে বিতর্কের আর কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম (গোট) হিসেবে মেসিকেই দেখেন।
রোনাল্ডো বলেন, ‘মেসি যখন মাঠে নামে, তখন প্রতিটি মুহূর্তই ইতিহাস হয়ে যায়। এখন সময় এসেছে বিশ্বফুটবলের সত্যটা মেনে নেয়ার- সে-ই সর্বকালের সেরা ফুটবলার।’
তিনি বলেন, ‘মাঠে সে যা করে, তা সব যুক্তির ঊর্ধ্বে। এই বয়সেও যে শান্ত, নিখুঁত ও কার্যকর ফুটবল খেলছে, তা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিরল সৌভাগ্য। প্রতি মৌসুমে এবং প্রতিটি বিশ্বকাপেই সে নিজের সেরাটা দিয়ে যাচ্ছে।’
দীর্ঘদিন ধরেই মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে সর্বকালের সেরা ফুটবলারের বিতর্ক চলে আসছে। ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ অধিনায়কও নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৯৭৩টি সিনিয়র গোলের মালিক।
আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তার গোলসংখ্যা ১৪৩, যা মেসির চেয়ে ২৩টি বেশি। তবে রোনাল্ডো নাজারিওর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই মেসিকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছে।
তিনি বলেন, ’রেকর্ড ভাঙার জন্যই তৈরি হয়, আর মেসি সেটা ভাঙবে- এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর্জেন্টিনা শক্তিশালী দল, কিন্তু পার্থক্য গড়ে দেয় মেসিই। এই বয়সেও তার জয়ের ক্ষুধা ও মানসিকতা অসাধারণ।’
২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এবার অবশ্য শুরু থেকেই দারুণ ছন্দে রয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ব্যক্তিগতভাবেও দিনটি বিশেষ ছিল মেসির জন্য।
ঠিক ২০ বছর আগে ২০০৬ বিশ্বকাপে ১৮ বছর বয়সে দেশের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ ফুটবলার হিসেবে অভিষেক হয়েছিল তার। দুই দশক পর একই বিশ্বমঞ্চে তিনি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হওয়ার কীর্তি গড়েন।
ম্যাচ শেষে আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচও মেসির শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘ক্লাস কখনো হারায় না। আমরা কোনো সাধারণ ফুটবলারের বিপক্ষে খেলিনি; এমন একজনের মুখোমুখি হয়েছিলাম, যিনি সাত-আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন।’
’সে অন্যদের চেয়ে অনেক সহজে কঠিন কাজগুলো করে ফেলতে পারে। পুরো আর্জেন্টিনা দল তাকে ঘিরেই খেলে এবং বহু বছর ধরে সে অবিশ্বাস্য সব কীর্তি গড়ে চলেছে।’
পরিসংখ্যানও তাই বলছে। আর্জেন্টিনার ১০টি শটের মাঝে সাতটিই নিয়েছেন মেসি। আর সেই আধিপত্যই যেন আবারো মনে করিয়ে দিলো- ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ইতিহাস লেখার কাজ এখনো শেষ হয়নি লিওনেল মেসির।



