বিশ্বকাপে স্পেনের কোনো ম্যাচ দেখলে মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানো কোঁকড়ানো চুলের একজন ফুটবলারের দিকে চোখ না গিয়ে উপায় নেই। তিনি স্পেনের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া। সম্প্রতি তিনি ইংলিশ ক্লাব চেলসি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছেন। আগামী মৌসুম থেকে স্প্যানিশ এই ক্লাবটির হয়ে খেলবেন তিনি।
গোল করার পর পেঙ্গুইনের মতো লাফিয়ে উদযাপন করাটা কুকুরেয়ার স্বতন্ত্র পরিচয় হয়ে উঠেছে।
এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেটে দেখেছিলাম, পেঙ্গুইন একবার সঙ্গী বেছে নিলে সারাজীবন তার সাথেই থাকে। পরিবারের সাথে তাদের বন্ধন অটুট থাকে। তাই আমার এই উদযাপন পরিবারের জন্য। ভালো-খারাপ সব সময় তারা আমার পাশে থেকেছে।’
২৮ বছর বয়সী কুকুরেয়ার সঙ্গী হলেন ক্লডিয়া রদ্রিগেজ। তাদের তিন সন্তান রয়েছে- মাতেও, রিও ও বেলা। কুকুরেয়া সবসময় বলেন, ফুটবলের চেয়েও তার কাছে পরিবার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের আসরে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন কুকুরেয়া।
তবে ফুটবলারদের জীবন বাইরে থেকে যতই নিখুঁত মনে হোক না কেন, তাদেরও ‘ব্যক্তিগত সমস্যা’ থাকে বলে স্বীকার করেন মার্ক কুকুরেয়া।
গ্যালারি থেকে যেসব দৈনন্দিন লড়াইয়ের কোনো আভাস পাওয়া যায় না, তার একটি হলো ছেলে মাতেওকে নিয়ে কুকুরেয়ার পথচলা।
মাত্র তিন বছর বয়সে মাতেওর অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) ধরা পড়ে। এটিকে তখন লেভেল-১ বা অটিজমের তুলনামূলকভাবে মৃদু পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এএসডি একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা।
এটি শিশুর চিন্তাভাবনা, কথা বলা, চলাফেরা ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অটিজমে আক্রান্ত অনেকের সামাজিকভাবে যোগাযোগে বা মানুষের সাথে মিশতে অসুবিধা হয়। সেইসাথে, একই ধরনের আচরণ বারবার করা এবং কিছু ক্ষেত্রে শেখা বা চিন্তাভাবনার বিভিন্ন দক্ষতার বিকাশে ভিন্নতাও অটিজমের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
‘আমাদের জীবনটাই বদলে দিয়েছে’
স্পেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিইকে কুকুরেয়া বলেন, ‘আমার বড় ছেলে আমাদের সবার জীবনই কিছুটা বদলে দিয়েছে। ও যখন নার্সারিতে যাওয়া শুরু করল, তখনই আমরা ওর মাঝে কিছু ভিন্ন বিষয় লক্ষ্য করতে শুরু করি। অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলার যেসব ছবি আসতো, সেখানে প্রায় সবসময়ই দেখা যেত যে ও একা আছে।’
তিনি বলেন, ‘ও একটু বড় হওয়ার পর দেখলাম, ও কথা বলছে না, আধো আধো শব্দও করছে না। ওই সময়টাই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন ছিল। নিজের সন্তানকে কষ্ট পেতে দেখার চেয়ে কঠিন আর কিছু নেই।’
ছেলের অটিজম নিয়ে কথা বলা এখনো কুকুরেয়ার জন্য সহজ নয়। অনেক সময় তিনি বুঝতেই পারেন না যে তিনি তার ছেলেকে কিভাবে সাহায্য করবেন।
তবে ছেলের অটিজম শনাক্ত হওয়ার পর জীবনকে আরো ধৈর্য, সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতার সাথে দেখতে শিখেছেন কুকুরেয়া।
তিনি মনে করেন, একজন শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলার হিসেবে তার পরিচিতি তাকে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। সেইসাথে, একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্য পরিবারগুলোর পাশেও দাঁড়াতে পারছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যে পরিচিতি আছে, তা যদি এই বিষয়টিকে আরো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে এবং আরো পরিবারকে সাহায্য করতে পারে, তাহলে আমি খুবই খুশি হবো। এর ফলে যদি আরো স্কুল, সহায়তা ও সাপোর্ট সেন্টার গড়ে ওঠে, সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
তিনি মনে করেন, ‘এই অভিজ্ঞতা আমাকে জীবনের কোন বিষয়গুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ আর কোনগুলো নয়, সেগুলোকে মূল্য ও অগ্রাধিকার দেয়া শিখিয়েছে।’
তিনি জানান, শুরুতে ছেলে যে স্কুলে পড়ত, সেখান থেকে খুব একটা সহযোগিতা পাননি তারা। অভিভাবক হিসেবে তখন নিজেদেরকে অসহায় কিংবা দিশেহারা মনে হতো।
কুকুরেয়ার স্ত্রী ক্লডিয়া রদ্রিগেজ বলেন, ‘স্কুল থেকে আমরা খুব একটা সহায়তা পাইনি। জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম মাসের মধ্য দিয়ে গেছি আমরা তখন। প্রতিদিন আমরা দু’জন একসাথে মাতেওকে স্কুলে পৌঁছে দিতাম, আর বাড়ি ফিরতাম কাঁদতে কাঁদতে। প্রতিটা দিন।’
‘আমাদের অনেক কিছু শিখতে হয়েছে’
কুকুরেয়া বলেন, ‘মাতেওকে মাথায় রেখেই আমাদেরকে সবসময় পরিকল্পনা করতে হয়। অনেক সময় আমরা কিছু একটা করতে চাই, কিন্তু ওর জন্য ভালো হবে না বলে তা করা যায় না। ছুটিতে যাওয়া সবসময়ই কঠিন, কারণ তখন ওর জন্য অনেক কিছু বদলে যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিছেন যে আপনার সন্তানের অটিজম আছে, ঠিক আছে। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আমরা তো এর জন্য প্রস্তুত থাকি না। তাই আমাদের অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। সম্ভবত মাতেও-ও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।’
এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কুকুরেয়া। তিনি বলেন, মাতেওকে কষ্ট পেতে দেখলে তারও খুব কষ্ট হয়।
এতদিন পর্যন্ত বড় ছেলে মাতেওকে তার ভাইদের সাথে গ্যালারিতে বসিয়ে খেলা দেখানো হয়নি, যাতে সে অস্বস্তিতে না পড়ে।
তবে স্প্যানিশ একটি রেডিও স্টেশনকে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের মতো এবারো বিশ্বকাপের ফাইনালে মাতেও উপস্থিত থাকার বিষয়ে।
কুকুরেয়ার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রে খুব গরম। এতে ওর অস্বস্তি হয়। ও ঠান্ডা পরিবেশ পছন্দ করে; যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা সুইমিং পুল আছে।’
সূত্র : বিবিসি



