বিশ্বকাপের অ্যাক্রেডিটেশন পেলেন কারাবন্দী ফরাসি সাংবাদিক

আলজেরিয়ায় কারাবন্দী ফরাসি সাংবাদিক ক্রিস্টোফ গ্লেইজকে ২০২৬ বিশ্বকাপ কাভারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে ফিফা। এই প্রতীকী পদক্ষেপ তার মুক্তির দাবিকে আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় এনেছে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
ক্রিস্টোফ গ্লেইজ
ক্রিস্টোফ গ্লেইজ |সংগৃহীত

বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরুর প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা আলজেরিয়ায় কারাবন্দী ফরাসি সাংবাদিক ক্রিস্টোফ গ্লেইজকে বিশ্বকাপ কভার করার জন্য আনুষ্ঠানিক অ্যাক্রেডিটেশন দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে ১১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই বিশ্বকাপের জন্য দেয়া স্বীকৃতি বাস্তবে তার কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ তৈরি না করলেও আন্তর্জাতিক মহলে তার বন্দী থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে নীরব থাকা ফিফার এই পদক্ষেপকে অনেকেই সাংবাদিকের মুক্তির দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন।

৩৭ বছর বয়সী ক্রিস্টোফ গ্লেইজ ফরাসি গণমাধ্যম গ্রুপ সো প্রেসের সহযোগী এবং জনপ্রিয় ফুটবল সাময়িকী সো ফুট-এর প্রতিবেদক। বর্তমানে তিনি আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সের পশ্চিমে অবস্থিত কোলেয়া কারাগারে বন্দী রয়েছেন।

ফিফার এই সিদ্ধান্তের খবর প্রথম প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অধিকার সংগঠন রিপোর্টার্স সাঁ ফ্রঁতিয়ের (আরএসএফ), যারা দীর্ঘদিন ধরে তার মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক প্রচারণা চালিয়ে আসছে।

সংগঠনটির মতে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের সাথে গ্লেইজের নাম যুক্ত হওয়ায় তার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের আরো বেশি নজরে আসবে।

২০২৪ সালের ২৮ মে গ্লেইজ আলজেরিয়ার তিজি উজু অঞ্চলে গিয়েছিলেন দেশটির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব জেউনেস স্পোর্তিভ দ্য কাবিলি (জেএস কাবিলি)-কে নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের সময় তাকে আটক করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। প্রথমে তাকে বিচারিক তত্ত্বাবধানে রাখা হলেও পরে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়।

২০২৫ সালের ২৯ জুন আলজেরিয়ার একটি আদালত তাকে সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। আদালতের রায়ে বলা হয়, তিনি ‘সন্ত্রাসবাদের প্রশংসা’ করেছেন এবং ‘জাতীয় স্বার্থের ক্ষতিকর প্রচারণামূলক প্রকাশনা’ নিজের কাছে রেখেছিলেন। একই বছরের ৩ ডিসেম্বর আপিল আদালতও সেই রায় বহাল রাখে।

আলজেরিয়ার বিচার বিভাগ অভিযোগ করে, গ্লেইজ কাবিলি অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনপন্থী সংগঠন মুভমঁ পুর ল’অতোনোমি দ্য লা কাবিলি (এমএকেএ)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। আলজেরিয়া সরকার সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

তবে এই অভিযোগকে শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে গ্লেইজের পরিবার, আইনজীবী এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলো।

তাদের দাবি, একজন সাংবাদিক হিসেবে বিভিন্ন পক্ষের সাথে কথা বলা এবং সাক্ষাৎকার নেয়া তার পেশাগত দায়িত্বের অংশ। তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করাকে সন্ত্রাসবাদ সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে দেখানো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক নজির তৈরি করতে পারে।

আরএসএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংগঠন মনে করে, গ্লেইজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মূলত তার সাংবাদিকতার কাজের সাথে সম্পর্কিত। ফলে তাকে কারাবন্দী রাখা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ সৃষ্টির শামিল। এসব সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে।

ফিফার সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে গ্লেইজের ঘটনা বিশ্বকাপের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে হাজারো সাংবাদিক যখন মাঠে বসে বিশ্বকাপ কাভার করবেন, তখন কারাগারে বন্দী এক সাংবাদিকের নামও থাকবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত প্রতিবেদকদের তালিকায়। এই প্রতীকী উদ্যোগের মাধ্যমে ফিফা একদিকে যেমন তার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কেও একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।

এদিকে, গ্লেইজের পরিবার এখন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের বিশেষ ক্ষমার আশায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপ ও বিশ্বব্যাপী আলোচনার ফলে তার মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। তাদের বিশ্বাস, একজন সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কারাগারে থাকা গ্লেইজের জন্য মানবিক ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ এখনো খোলা রয়েছে।

বিশ্বকাপের উত্তেজনার মধ্যেও তাই ক্রিস্টোফ গ্লেইজের নাম এখন শুধু একজন কারাবন্দী সাংবাদিকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নেই। তার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং তথ্য সংগ্রহের অধিকারের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।