এ যেন এক থ্রিলার সিনেমার গল্প। পরতে পরতে যার ছড়িয়ে রহস্য। যখন মনে হচ্ছিলো এই বুঝি শেষ সব, তখনই নতুন নাটক হয় মঞ্চস্থ। জয়-পরাজয় ছাপিয়ে যেখানে জিতেছে ক্রিকেট।
হারার আগে হার নয়—এই লাইনটাই যেন সত্য হয়ে উঠেছিল গতকাল রোববার মিরপুরে। স্কোরকার্ড হয়তো বলবে ১ উইকেটে হেরেছে বাংলাদেশ। কিন্তু গা হিম করা সেই মুহূর্তটাকে ধারণ করার সাধ্যি কি আছে তার?
ক্রিকেটে রূদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের গল্প অনেক আছে, তবে এমন অসম্ভবকে সম্ভব করার দৃঢ় সংকল্প বিরল ক্রিকেটে। ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেও কারো যেন কোনো অতৃপ্তি নেই, অস্বস্তি নেই।
এই ম্যাচে নেতৃত্ব দেয়া নাজমুল হোসেন শান্তও ম্যাচের প্রতিক্রিয়ায় অবলীলায় জানিয়েছেন—‘ভেরি হ্যাপি’। কারণটাও জানিয়েছেন, ‘এই ম্যাচ আমাদের বিশ্বাস দিয়েছে, যেকোনো সময় আমরা ম্যাচে ফিরতে পারি।’
একটা মনে হচ্ছিলো হয়তো সহজেই জিতে যাবে অস্ট্রেলিয়া। ৪৫ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে তাদের রান তখন ২৬৬। জয়ের জন্য তখন ৩০ বলে আর ৯ রান প্রয়োজন। হেসে খেলেই জেতার কথা।
তবে হঠাৎ বদলে যায় ম্যাচের গতিপথ। পরের ৪ ওভারে মাত্র ৬ রান দিয়ে ৪ উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ! ঘুরে যায় ম্যাচের মোড়। মোড়টা ঘুরিয়ে দেন মূলত শরীফুল ইসলাম। নিজের শেষ ২ ওভারে মাত্র ১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন তিনিই।
এরপর মোস্তাফিজ ১ উইকেট নিলে অবস্থাটা এমন দাঁড়ায় যে শেষ ওভারে অজিদের প্রয়োজন ৩ রান, বাংলাদেশের চাই ১ উইকেট। যেখানে অবশ্য আর পেরে উঠেনি বাংলাদেশ। শেষ হাসি হেসেছে অজিরাই।
তবে ক্রিকেট যে চির অনিশ্চয়তার খেলা, পরতে পরতে যেন তারই জানান দিয়ে গেল ম্যাচটা। ম্যাচটা তো ছিল মূলত শরীফুলেরই। নিউজিল্যান্ড সিরিজে দারুণ বল করেও অজিদের বিপক্ষে ছিলেন জায়গা হয়নি প্রথম দুই ম্যাচের একাদশে।
নাহিদ রানাকে বিশ্রাম দেয়ায় এই প্রথম সুযোগ পান সিরিজে। সেটিকে কী স্মরণীয়ই না করে রাখলেন এই বাঁহাতি পেসার! প্রথম ওভারেই জোড়া আঘাত করে শুরু, যা টানলেন একদম শেষ পর্যন্ত।
ক্যারিয়ারে প্রথমবার পেলেন ৫ উইকেটের দেখা, গড়েছেন ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। ৪৮ রানে ৬ উইকেট নিয়েছেন একাই তিনি। তার লড়াইয়ের কারণেই দল মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়তে পারে। হেরেও জিতে যায়।
তাই ম্যাচ শেষে তাকে নিয়ে গর্ব করছেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। নিয়মিত না খেলেও ভালো করা কতটা কঠিন, তা বোঝেন বলেই শরীফুলের প্রশংসা করলেন মিরাজ।
‘শরীফুল অবশ্যই অনেক ভালো বোলিং করেছে। একজন খেলোয়াড়ের জন্য এ রকম ‘অন অ্যান্ড অফ’ খেলাটা অনেক কঠিন। সবশেষ সিরিজেও ভালো বোলিং করেছে এবং আজকেও ভালো বোলিং করেছে।’
‘রানা প্রথম দিকে খেলেছে, ভালো বোলিং করেছে। শরিফুল সুযোগ পাচ্ছিল না। সে নিজেকে প্রমাণ করেছে ভালো জায়গায়, ভালো উইকেট নিতে পারি।’
সাম্প্রতিক সময়ের নিয়মিত চিত্রই অবশ্য এটি। পেস আক্রমণের নামগুলোর মধ্যে কেউ বদলে গেলেও আক্রমরণের ধার কমে না। পেসারদের মধ্যে এই তাড়না তৃপ্তি দিচ্ছে অধিনায়কে।
দর্শকদের অনেকে মাঠ ছেড়ে গিয়েছিলেন ম্যাচ শেষের বেশ আগেই। ম্যাচে তেমন উত্তেজনাই যে ছিল না! কিন্তু মাঠে থাকা দল হাল ছাড়েনি। মিরাজও বললেন, হারার আগে না হারার বিশ্বাসই দলকে নিয়ে গিয়েছিল জয়ের কাছে।
‘মোমেন্টাম একবার ওদের কাছে যাচ্ছিল, একবার আমাদের কাছে আসছিল। ক্রিকেট খেলায় এটাই হয়ে থাকে। যারা সুযোগ কম দেবে, তাদেরই ম্যাচ জেতার চান্স থাকে। আমরা একটা সময় ওদেরকে সুযোগ দিয়েছি, ওরা সুযোগটা নিয়েছে।’
‘আবার আমরা যখন ভালো জায়গায় বল করেছি, উইকেট নিয়েছি, তখন আমরা আবার ওদেরকে চাপে ফেলিয়েছি। বিশ্বাস ছিল সবার যে ম্যাচটা জিততে পারব। হয়তো এজন্য অনেক ক্লোজে গিয়েছে ম্যাচ।’



