কার্ডিফ ফিরল মিরপুরে, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

২০০৫ সালে কার্ডিফের পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অবশেষে মিরপুরে এসে দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচ জিতল বাংলাদেশ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ব্যাটে-বলে দারুণ পারফর্ম করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ
ব্যাটে-বলে দারুণ পারফর্ম করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ |ক্রিকইনফো থেকে নেয়া ছবি

কার্ডিফ যেন ফিরে এলো মিরপুরে, হলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ২০০৫ থেকে ২০২৬: ফুরালো দুই দশকের অপেক্ষা। ছয়বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয়বারের মতো পরাজিত করলো বাংলাদেশ।

আজ মিরপুরে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে বৃষ্টি আইনে ৮৬ রানে হারিয়েছে টাইগাররা। ক্যাঙ্গারুদের বিপক্ষে ঘরের মাঠে এটাই বাংলাদেশের প্রথম জয়। ২০০৫ সালের জয়টা ছিলো ইংল্যান্ডের মাটিতে।

মঙ্গলবার টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে ৮ উইকেটে ২৮৪ রান তুলে স্বাগতিক দল। যে চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে পারেনি অজিরা, ৪২.২ ওভারে ৯ উইকেটে ১৯১ রাব তুলতে পারে তারা। এরপর বৃষ্টি নামলে খেলা বন্ধ হয়ে যায়।

ঐতিহাসিক এই জয়ের নায়ক মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। দীর্ঘ চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরেই আলো কেড়েছেন তিনি। ব্যাটে-বলে-ফিল্ডিংয়ে দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে বাজিমাত করেছেন মোসাদ্দেক।

ব্যাট হাতে ৭০ বলে অপরাজিত ৮৬ রান করার পর বল হাতে পুরো ১০ ওভার বোলিং করে ৩৭ রানে নেন ২ উইকেট। তবে বল হাতে অজিদের গুঁড়িয়ে দেয়ার আসল কারিগর নাহিদ রানা।

পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ দুই সিরিজ জয়ের নায়ক এই ম্যাচেও জ্বলে ওঠেন। তার বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতে পারেনি অজিরা, মাত্র ৪১ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন এই পেসার।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে ওয়ানডেতে তিনটির বেশি উইকেট নিলেন নাহিদ রানা। আগের সেরা ছিল বাঁহাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাকের। ৩৬ রানে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।

এদিন ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই হারায় সাইফ হাসানের (৫) উইকেট। তবে সেই ধাক্কা দ্রুতই সামলে ওঠে দল তানজিদ তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটে।

দুজনের জুটিতে আর কোনো বিপদ ছাড়াই ১৬ ওভারে তিন অঙ্কে পৌঁছে যায় সংগ্রহ। তামিম ক্যারিয়ারের সপ্তম ফিফটি তুলে নেন ৪১ বলে। তবে ইনিংসটা আর বড় হয়নি, ৪৪ বলে ৫৪ রান নিয়ে থামেন তিনি।

তামিম ফেরার পরপরই লিটন দাসকে সাক্ষী রেখে ফিফটি পূরণ করেন শান্ত। ওয়ানডেতে নিজের ১২তম ফিফটি তুলে নেন ৫৭ বলে। অবশ্য লিটনের সাথে জুটি জমেনি তার, ৯ বলে ৭ করে ম্যাট রেনশর শিকার হন লিটন।

এরপর তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে দলের হাল ধরার চেষ্টা করেন শান্ত। তবে পারেননি, ২৫.৩ ওভারে দলকে ১৪০ রানে রেখে ফেরেন তিনি। উড়িয়ে মারতে গিয়ে ৮৬ বলে ৬৭ রান করে আউট হন শান্ত।

শান্ত ফেরার পর মাঠে আসেন মোসাদ্দেক। চার বছর পর জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নামেন তিনি। ২০২২ সালের আগস্টের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরলেও থিতু হতে সময় নেননি। শুরু থেকেই ছিলেন সাবলীল।

তাওহীদ হৃদয়ের সাথে জুটি গড়ে টানতে থাকেন দলকে। তাদের ব্যাটে ভর করে ৩৮তম ওভারে দুই শ’ স্পর্শ করে বাংলাদেশ। তবে ৪০.৩ ওভারে দলের রান ২১৫ পর্যন্ত পৌঁছাতেই ভাঙে জুটি।

৯০ বলে ৭৫ রানের জুটি ভেঙে হৃদয় ফেরেন ৫১ বলে ৩১ করে। সাতে নেমে সুবিধা করতে পারেননি মেহেদী মিরাজ। ১২ বলে ৩ রানে আউট তিনি। দ্রত ফেরেন তানভীর ইসলামও (৫)। দলের সংগ্রহ ৪৪.৩ ওভারে ২৩৯/৭।

এরপর তাসকিনকে নিয়ে ইনিংসের বাকি পথটা হাঁটেন মোসাদ্দেক। নিজ ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন। তাসকিন শেষ বলে আউট হওয়ার আগে করেন ১৬ বলে ২০ রান।

অজিদের হয়ে নাথান এলিস ৩৮ রানে ৩, লিয়াম স্কট ও ম্যাট রেনশ নেন দুটো করে উইকেট।

রান তাড়া করতে নামা সফরকারীদের মাত্র ২ রানেই জোড়া উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। প্রথম উইকেট আসে একদম প্রথম বলেই। তাসকিন আহমেদের বলে স্ট্যাম্প ভাঙে ম্যাথু শর্টের (০)।

পরের উইকেট নেন মোস্তাফিজ। ৬ বলে ১ রান করা মার্নাস লাবুশেনকে এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলেন তিনি। বিপদে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। বিপদ বাড়তে পারতো আরো, সুযোগও এসেছিল।

চতুর্থ ওভারে মোস্তাফিজের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়েছিলেন কনোলি, তানজিদ তামিম সহজ ক্যাচটি নিতে পারেননি। জীবন পেয়ে অধিনায়ক জশ ইংলিসকে নিয়ে ইনিংসের হাল ধরেন তিনি।

দুজনের জুটিতে আর কোনো বিপদ ছাড়াই পাওয়ার প্লেতে ৫০ রান যোগ করে অজিরা। তবে পাওয়ার প্লে শেষ হতেই ভাঙে তাদের প্রতিরোধ। অজি অধিনায়ককে তুলে নেন নাহিদ রানা।

উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ইংলিস। আউট হন ২৫ বলে ১৯ করে। অস্ট্রেলিয়ার রান তখন ৩ উইকেটে ৫৩। সেখান থেকে কনোলি ও অ্যালেক্স ক্যারি মিলে দলকে ৯১ রানে পৌঁছান।

এরপরই আঘাত আনেন মোসাদ্দেক। ব্যাট হাতে দারুণ পারফর্ম করা এই অলরাউন্ডার বল হাতেও পেয়ে যান উইকেটের দেখা। তুলে নেন কনোলিকে। ৫০ বলে ৩৫ করে বোল্ড হন কনোলি।

এরপর ক্যামেরন গ্রিনকে নিয়ে ইনিংস টানেন ক্যারি। রান করছিলেন দেখেশুনে। অপেক্ষায় ছিলেন ফিফটি পূরণের। তবে স্বাদ পূরণ হতে দেননি নাহিদ রানা। ৬২ বলে ৪৭ রানে আটকে দেন তাকে।

সেই উইকেটের রেশ না কাটতেই ফের উদযাপনের উপলক্ষ এনে দেন মোসাদ্দেক। স্পিন ভেল্কিতে বোকা বানান ম্যাট রেনশকে। ৪ বলে ২ করে এলবিডব্লু হয়ে ফেরেন এই অলরাউন্ডার।

পরের ওভারে এসে আবারো আঘাত আনেন নাহিদ। এবার তার শিকার অভিষিক্ত লিয়াম স্কট। ১৪৬ কিলোমিটার গতিতে ধেয়ে আসা বাউন্সারে গালিতে হৃদয়ের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন তিনি।

তাতে ৩২.১ ওভার শেষে অজিদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেট ১৪০ রান। এরপর মোস্তাফিজ এলিসকে ফেরালে জয়ের পথে আরো একধাপ এগিয়ে যায় টাইগাররা। তবে এরপর বাঁধা হয়ে দাঁড়ান ক্যামেরন গ্রিন।

শেষ উইকেটে এডাম জাম্পাকে সাথে নিয়ে গড়েন ৩৫ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি। নিজেও তুলে নেন ফিফটি। এই জুটি থামায় আবহাওয়া। হঠাৎ বজ্রপাতের পর নামে বৃষ্টি। বন্ধ হয়ে যায় খেলা।

ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকে মাঠ ছাড়তে হয় টাইগারদের। তখন ৬৬ বলে ৫২ রানে অপরাজিত আছেন গ্রিন। এরপর অবশ্য আর ব্যাট করতে নামতে পারেননি তিনি। বৃষ্টি না থামায় ম্যাচ নিষ্পত্তি হয় বৃষ্টি আইনে।