সৈয়দ মূসা রেজা
মাকড়শা, রেশম পোকা আর মৌমাছির মধ্যে মিলটা কোথায়? প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এমন প্রশ্ন করা হলে অনেকেই দোয়া-ই-ইউনুস পড়তে শুরু করতে পারেন। আসলে এ তিন প্রাণীরই একটি বিস্ময়কর মিল আছে। তারা সবাই সুতো তৈরি করে। মাকড়শা জাল বোনার জন্য, রেশম পোকার শূককীট গুটি বা কোকুন তৈরির জন্য আর মৌমাছি চাকের কোষ তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য মোমের পাশাপাশি লার্ভাকে বেঁধে রাখতে সূক্ষ্ম রেশমসদৃশ সুতো তৈরি করে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা উচিত—মাকড়শা, রেশম পোকার লার্ভা এবং মৌমাছির লার্ভা—তিনটিই রেশমজাতীয় সুতো তৈরি করতে সক্ষম। তাহলেই দান মেরে দিলেন। ছক্কা ঠেকায় কে!
বাংলা আধুনিক কবিতাকে এ মাটির রসে সিক্ত করার জন্য কবি আল মাহমুদ বলেছেন, 'গায়ের পথে উড়াল দেবে শব্দ চুরির ইচ্ছায়/ ইচ্ছে মতো শব্দ ভাবে দাদী-নানীর কিচ্ছায়।' স্মৃতি হাতড়ে বলছি। ভুলভাল থাকতেই পারে। বিজ্ঞান মহলের আজকের জোরালো ভাবধারাও অনেকটা তেমনি। তারা চাইছে 'গায়ের পথে উড়াল' দিতে। তাদের কাছে 'গায়ের পথ' মানে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া। গভীর ভাবে তাকানো। নতুন করে পর্যবেক্ষণ করা। এভাবেই নতুন আবিষ্কারের সূত্র পাওয়া যাবে, নিশ্চিত তারা। এরই সূত্র ধরে মৌমাছির 'সুতোর' দিকে তাদের নজর পড়েছে। কীভাবে এই সুতো কাজে লাগানো যায় তাও তাদের ভাবনায় ধরা পড়েছে। সায়েন্স অ্যালার্ট ওয়েবসাইটে এ নিয়ে গল্প শুনিয়েছেন বিজ্ঞান লেখক ফিওনা ম্যাকডোনাল্ড। সায়েন্স এলার্ট জানিয়েছে, প্লাস্টিকের ভিড়ে যখন পুরো পৃথিবী ডুবে যাচ্ছে, তখন গবেষকেরা ওজনে হালকা, শক্ত এবং প্রাকৃতিকভাবে পচনশীল এমন এক কাজের উপাদানের সন্ধানে নেমেছেন। আর এই লড়াইয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে মৌমাছির রেশম বা সিল্ক।।
প্লাস্টিকের দুনিয়ায় মানুষ যখন পরিবেশবান্ধব বিকল্পের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে, তখন গবেষকদের চোখ বারবার ফিরছে প্রকৃতির দিকে। হালকা, শক্ত আর সহজে মাটির সাথে মিশে যেতে পারে—এমন উপাদান খুঁজতে গিয়ে এতদিন আলোচনার কেন্দ্র ছিল মাকড়শার রেশম। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, আরেকটি সম্ভাবনাময় উপাদান এতদিন সবার চোখের সামনেই ছিল—মৌমাছির রেশম।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং আণবিক জীববিজ্ঞানী ওরান ওয়াসারম্যান সায়েন্স এলার্টকে বলেন, প্রকৃতিতে রেশম উৎপাদন মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। শুধু কীটপতঙ্গের মধ্যেই অন্তত ২৩ বার আলাদাভাবে রেশম তৈরির ক্ষমতা বিকশিত হয়েছে। পিঁপড়া, মৌমাছি আর বোলতাসহ অনেক প্রাণীই কোনো না কোনোভাবে রেশম তৈরি করে।
চলতি বছরের শুরুতে ওয়াসারম্যান ও তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মৌমাছির রেশম থেকে পাতলা ফিল্ম বা আবরণ তৈরি করতে সক্ষম হন। এই সাফল্য ভবিষ্যতে মৌমাছির রেশমকে কাজে লাগানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পোকামাকড়ের জগতে রেশমের ব্যবহারও বিচিত্র। কোথাও জাল তৈরিতে, কোথাও বাসা বানাতে, আবার কোথাও কোকুন বা গুটি তৈরিতে। মৌমাছির ক্ষেত্রে এর প্রধান কাজ সুরক্ষা দেয়া।
সব মৌমাছি অবশ্য রেশম তৈরি করে না। তবে যারা করে, তাদের মধ্যে সামাজিক ও একাকী—দুই ধরনের প্রজাতিই রয়েছে। মধুমক্ষিকা ও ভোমরার মতো সামাজিক মৌমাছি তাদের উপনিবেশের শিশু মৌমাছিদের থাকার কক্ষের ভেতর আস্তরণ হিসেবে এই রেশম ব্যবহার করে। আর একাকী মৌমাছিরা রেশম দিয়ে কোকুন তৈরি করে, যা তাদের পরিবেশগত চাপ রক্ষা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন শত্রুর হাত থেকে বাঁচায়।
বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ মৌমাছি প্রজাতিই একাকী জীবনযাপন করে। গবেষকদের নজর ছিল এমনই একটি প্রজাতির দিকে—ব্লু অরচার্ড বি বা অস্মিয়া লিগনারিয়া। ছোট আকারের এই মৌমাছি ফলের বাগানের গুরুত্বপূর্ণ পরাগবাহক। এদের বাদামি রঙের লম্বাটে কোকুনের এক প্রান্তে স্তনের মতো একটি বিশেষ ঢাকনা থাকে।
দেখতে সাধারণ হলেও এই কোকুন আশ্চর্য রকমের শক্ত। রেশম পোকার কোকুন তৈরি হয় একটি টানা সুতা দিয়ে। কিন্তু উত্তর আমেরিকার একাকী প্রজাতির মৌমাছি ব্লু অরচার্ড-এর লার্ভা কাজটা করে একেবারে ভিন্নভাবে। লার্ভা প্রথমে বাসার দেয়ালে সূতা আটকে দেয়। এরপর মাথা নাড়িয়ে সেই সূতা টেনে অন্য জায়গায় লাগায়। এভাবে বারবার একই কাজ করতে করতে পুরো কোকুন তৈরি হয়। কোকুনটির স্তর খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি স্তর মিলে গ্যাস চলাচল, যান্ত্রিক সুরক্ষা, আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং পরজীবী আক্রমণ ঠেকানোর কাজ করে।
বিশেষ করে পরজীবী আগ্রাসী বোলতার বিরুদ্ধে এই কোকুনই লার্ভার একমাত্র ভরসা। এসব বোলতা রাসায়নিক সংকেত অনুসরণ করে মৌমাছির কোকুন খুঁজে বের করে। এরপর সূচের মতো অঙ্গ দিয়ে কোকুনে ছিদ্র করে ভেতরে ডিম পাড়ার চেষ্টা করে। তাই কোকুনের ছিদ্র প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে এখন আরো বিস্তারিত গবেষণা চলছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারের সেলাই, টিস্যু প্রকৌশল এবং বিশেষ ধরনের বস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মৌমাছির শরীরের বাইরে এই রেশম তৈরি করা। শুরুর দিকে গবেষকরা তৈরি হয়ে যাওয়া কোকুন থেকে আলাদা আলাদা সূতা সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এতে প্রচুর সময় লাগত এবং অধিকাংশ সূতাই ছিড়ে যেত। শেষ পর্যন্ত তারা ফিরে যান মূল উৎসে—মৌমাছির লার্ভার মুখে। ওরান ওয়াসারম্যান জানান, তারা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে লার্ভার মুখ থেকে সরাসরি রেশমের সূতা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি একটি বিশেষ লালন-পালন ব্যবস্থা। এটি মৌমাছির প্রাকৃতিক বাসার পরিবেশ অনুকরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের পলিনেটিং ইনসেক্ট রিসার্চ ইউনিট এই ব্যবস্থা তৈরি করেছে। গবেষকরা প্রতিদিন লার্ভাগুলোর ওপর নজর রাখেন। ঠিক যখন লার্ভা সূতা কাটা শুরু করে এবং প্রথম সূতাগুলো এখনো ঢিলে অবস্থায় থাকে, তখনই সেগুলো সংগ্রহ করা হয়। এরপর যান্ত্রিক পরীক্ষা চালানো হয়।
গবেষকদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, এই প্রক্রিয়ার পরও লার্ভাগুলো স্বাভাবিকভাবে তাদের কোকুন তৈরি শেষ করতে পারে। অর্থাৎ পদ্ধতিটি খুবই কম হস্তক্ষেপমূলক। লার্ভার কোনও ক্ষতি করে না।
এরপর বিজ্ঞানীরা আণবিক জীববিজ্ঞানের কৌশল ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় জিন বিশেষভাবে তৈরি করা অণুজীবের মধ্যে প্রবেশ করান। সেই অণুজীব পরীক্ষাগারে মৌমাছির রেশমের প্রোটিন তৈরি করে। পরে ফাইব্রোইন নামেও ওই প্রোটিনকে বিশুদ্ধ করে স্বচ্ছ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ফিল্মে রূপ দেয়া হয়।
এটাই প্রথমবারের মতো কোনো একাকী মৌমাছির রেশম প্রোটিনকে এভাবে তৈরি করে ব্যবহারযোগ্য উপাদানে পরিণত করার ঘটনা।
এখনো অবশ্য এটি সরাসরি ব্যবহার করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে নতুন এই প্রযুক্তি বিভিন্ন প্রজাতির মৌমাছির রেশম নিয়ে গবেষণার দরজা খুলে দিয়েছে।
গবেষকরা জানেন, মধুমক্ষিকার রেশম অরচার্ড মৌমাছির রেশমের চেয়ে বেশি প্রসারণশীল। ভবিষ্যতে একই পদ্ধতিতে সেটিও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি অন্য উপাদানের সাথে মিশিয়েও নতুন ধরনের বস্তু তৈরি হতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। 'পাগলা বাবার নজর' কোথায় গিয়ে পড়ে, তা যেমন বলা মুশকিল। বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী চোখও তেমনি থেমে থাকে না এক জায়গায়। এবার তাদের নজর পড়েছে সাগরের অতলে। ওয়াসারম্যানের দল এখন মৌমাছির রেশমের সাথে গভীর সমুদ্রের চোয়ালবিহীন হ্যাগফিশ মাছের আঠালো শ্লেষ্মা মিশিয়ে নতুন উপাদান তৈরির চেষ্টা করছে। এই শ্লেষ্মার ভেতরে থাকা প্রোটিন তন্তুগুলো টেনে শুকিয়ে নিলে তাদের যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যও মাকড়শার রেশমের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। মৌমাছির রেশম আর হ্যাগফিশের প্রোটিনের গঠনেও মিল রয়েছে। ফলে দুটিকে একসাথে মিশিয়ে এমন উপাদান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা উভয়ের সেরা বৈশিষ্ট্য বহন করবে।
হাজার বছর ধরে মানুষ নানা কাজে রেশম ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু গবেষণার আলোটা এতদিন ছিল মূলত রেশম পোকা আর মাকড়শার ওপর। আণবিক জীববিজ্ঞানী ওরান ওয়াসারম্যান বলছেন, কীটপতঙ্গের জগতে রেশমের বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। অসংখ্য প্রাণী ভিন্ন ভিন্ন গঠন আর বৈশিষ্ট্যের রেশম তৈরি করে। অথচ তাদের অনেক কিছুই এখনো অজানা রয়ে গেছে।
তাই হয়তো বিজ্ঞানীরা আবারো 'গায়ের পথে উড়াল' দিতে চাইছেন। নতুন কোনো গ্রহে নয়, দূর মহাকাশেও নয়; উত্তর খুঁজছেন প্রকৃতির ভেতরেই।
মাকড়শা, রেশম পোকা আর মৌমাছির সেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নটার উত্তর হয়তো এবার বিজ্ঞানীরাও নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন। মাকড়শার জাল আর রেশম পোকার গুটির পাশে এতদিন নীরবে পড়ে ছিল মৌমাছির সূক্ষ্ম সুতো। বিজ্ঞানীরা এবার তার দিকেও তাকিয়েছেন। আর প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার সেই যাত্রায় হয়তো সেখান থেকেই মিলবে আগামী দিনের নতুন কোনো উপাদানের খোঁজ।



