হাসিনার ফেরার পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে এমন একটি সংবেদনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর যেকোনো পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার ফেরা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র পাল্টা বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। জুলাই আন্দোলনকারীদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান বড় ধরনের সংঘাতের কারণ হতে পারে। তাকে কারারুদ্ধ করা হলে তিনি তার সমর্থকদের কাছে একজন ‘রাজনৈতিক শহীদ’ হিসেবে গণ্য হতে পারেন। এটি বাংলাদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জন্য একটি সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, যা দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক সমাবেশ ও জন-অসন্তোষের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণাকে অনেকে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই মনে করলেও এ পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। কারণ দেশে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর রয়েছে। নির্বাসনে থেকে দল পরিচালনা করার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাসিনা মনে করেন, তার উপস্থিতি দলকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এবং ভবিষ্যতে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের মতো সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের জন্য পথ সুগম করতে পারে। পলাতক বা ‘ফেরারি’ তকমা ঝেড়ে ফেলে তিনি নিজেকে এমন একজন নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করতে চান, যিনি নিজ দেশে বিচার মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।

হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে এমন একটি সংবেদনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর যেকোনো পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার ফেরা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র পাল্টা বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। জুলাই আন্দোলনকারীদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান বড় ধরনের সংঘাতের কারণ হতে পারে। তাকে কারারুদ্ধ করা হলে তিনি তার সমর্থকদের কাছে একজন ‘রাজনৈতিক শহীদ’ হিসেবে গণ্য হতে পারেন। এটি বাংলাদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জন্য একটি সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, যা দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক সমাবেশ ও জন-অসন্তোষের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার যদি হাসিনার বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করে বা নমনীয়তা দেখায়, তবে ২০২৪ সালের আন্দোলনের শহীদদের পরিবার এবং জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে। তারা এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকে একটি ‘আপসহীন’ বিষয় হিসেবে দেখে, ফলে সরকারের যেকোনো শিথিলতা নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

হাসিনার সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষè নজরদারিতে থাকবে। বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। সামগ্রিকভাবে, তার ফেরা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করতে পারে। হাসিনা আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মামলাকে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার দিকে ঘুরিয়ে দিতে চান। তবে হাসিনার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে গেছে। নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের অংশ হিসেবে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং এনসিপি একটি শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। সাধারণ মানুষের কাছে হাসিনার ফেরা রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে বরং ন্যায়বিচারের সুযোগ হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক তুলনা ও উপসংহার ইতিহাসে বেনজির ভুট্টো বা থাকসিন সিনাওয়াত্রার মতো নেতাদের নির্বাসন থেকে ফেরার নজির থাকলেও হাসিনার পরিস্থিতি অধিকতর জটিল। কারণ ২০২৫ সালের নভেম্বরে, ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার অধীনে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান কেবল হাসিনার ফেরার ওপর নির্ভর করে না, বরং দলটিকে বিগত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসন, দুর্নীতি এবং হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করতে হবে। শেষ পর্যন্ত হাসিনার এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। আত্মসমর্পণের মাধ্যমে হাসিনা আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু বদলে দিতে পারেন। তখন প্রশ্নটি কেবল তিনি বিচারের মুখোমুখি হবেন কি না তা থাকবে না, বরং বিচার প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না সেই দিকে চলে যাবে।

তবে অনেক বাংলাদেশীর কাছে বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে জবাবদিহিতার সাথে বেশি সম্পৃক্ত। জুলাই এবং আগস্টে যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবার এবং যারা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন তাদের কাছে হাসিনার প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে বরং ন্যায়বিচারের সুযোগ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য খুব একটা আগ্রহ নেই। একই সাথে, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখা উচিত কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিএনপি নিজেই আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার ফলে নির্বাচনী সুবিধা পেয়েছে। এখন ক্ষমতায় এসে তারা একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বের সম্মুখীন। আওয়ামী লীগের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত সে বিষয়ে তারা মিশ্র সঙ্কেত দিচ্ছে। যদিও সরকার আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে, তবুও কিছু বিএনপি নেতা যুক্তি দিয়েছেন যে দল নয়, বরং ভোটারদেরই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত।

এদিকে আওয়ামী লীগ একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুসরণ করছে বলে মনে হচ্ছে। তারা এখনই ক্ষমতায় ফিরতে চাইছে না। বর্তমানে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে টিকে থাকাই যথেষ্ট। হাসিনাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে এমনকি কারাগার থেকেও দলটি সাংগঠনিক ভাঙন রোধ এবং অবশিষ্ট সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ রাখার আশা করতে পারে। এটিও যুক্তি দেয়া যেতে পারে যে একটি বৃহৎ দলকে বাইরে রেখে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে না।

বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী রাজনৈতিক বিশ্লেষক যুক্তি দেন যে আওয়ামী লীগ চাইলেই রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে না; ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দায় তাদের স্বীকার করতে হবে। কর্তৃত্ববাদী শাসন, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া সহিংসতার বিষয়ে জনক্ষোভ স্বীকার করতে দলটি যতক্ষণ কুণ্ঠিত থাকবে, ততক্ষণ বৃহত্তর জনআস্থা পুনর্গঠন করা কঠিন হয়েই থাকবে। ইতিহাস বলছে যে নির্বাসন খুব কমই স্থায়ী রাজনৈতিক কৌশল হয়। অনেক ক্ষমতাচ্যুত নেতা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরেছেন, এই বিশ্বাসে যে বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ের চেয়ে জেলখানা বা ব্যক্তিগত জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে দেশে থেকে তারা অনেক বেশি কিছু অর্জন করতে পারবেন।

হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যদি সত্যিই ঘটে, তবে তা দেখাবে যে দেশের অন্যতম এক উত্তাল অধ্যায়ের পর জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং আইনের শাসন একসাথে সহাবস্থান করতে পারে কি না। (সংক্ষেপিত)