বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের শরীরে রয়েছে এক রহস্যময় ভাইরাস। নাম তার এপস্টাইন-বার ভাইরাস (ইবিভি)। এতদিন এই ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছেন।
ইবিভি ভাইরাসের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু সমস্যা হলো, একবার শরীরে ঢুকলে এ ভাইরাসটি আমৃত্যু থেকে যায়। শুধু তাই নয়, এটি ক্যান্সার ও মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো মারাত্মক সব স্নায়বিক রোগের কারণ হতে পারে।
সায়েন্স অ্যালার্টের সূত্রে লেখক ডেভিড নিল্ড জানিয়েছেন, বিজ্ঞানীরা এমন কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি করেছেন যা এই ভাইরাসকে শুরুতেই প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
সহজ করে বললে, অ্যান্টিবডি হলো শরীরের নিজস্ব প্রহরীর মতো এক ধরনের প্রতিষেধক, যা ক্ষতিকর ভাইরাসকে চিনে নিয়ে তাকে ধ্বংস করে ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার সেন্টার ও ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের গবেষকরা এই অসাধ্য সাধন করেছেন। তারা এমন সব অ্যান্টিবডি তৈরি করেছেন যা ভাইরাসের ওপর থাকা বিশেষ দু’টি প্রোটিনকে অকেজো করে দেয়। এই প্রোটিনগুলো ব্যবহার করেই ভাইরাসটি আমাদের শরীরের বি-সেল বা শ্বেত রক্তকণিকায় ঢুকে পড়ে। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান দুর্গ হলো এই বি-সেল। ভাইরাসটি সেখানে একবার ঢুকে পড়লে তাকে আর বের করা সম্ভব হয় না।
বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ল্যাবে তৈরি এই নতুন প্রতিষেধক ভাইরাসের সেই প্রবেশের পথটিই বন্ধ করে দেয়। এতে ভাইরাসটি যেমন শরীরে বাসা বাঁধতে পারে না, তেমনি ভবিষ্যতে এটি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগও পায় না।
গবেষক দলের সদস্য বায়োকেমিস্ট অ্যান্ড্রু ম্যাকগুয়ের মতে, এ ভাইরাসটি শরীরের প্রায় প্রতিটি বি-সেলের সাথে নিজেকে আটকে ফেলার ক্ষমতা রাখে, তাই এর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি খুঁজে পাওয়া ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
এই বাধা কাটাতে বিজ্ঞানীরা এক অভিনব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তারা বিশেষ ধরনের ইঁদুর ব্যবহার করে মানুষের মতো জেনেটিক অ্যান্টিবডি তৈরি করেছেন। ফলে ভবিষ্যতে যখন এটি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হবে, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে সহজে গ্রহণ করে নেবে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিজ্ঞানীদের তৈরি ১০টি নতুন অ্যান্টিবডির মধ্যে একটি বিশেষভাবে কার্যকরী এবং তা ভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি রুখে দিতে পেরেছে।
এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন প্যাথোবায়োলজিস্ট ক্রিস্টাল চ্যান। সাধারণত এই ভাইরাস থেকে প্রথমে গ্রন্থি জ্বর বা গ্ল্যান্ডুলার ফিভার হয়। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এই ভাইরাস প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যারা প্রতি বছর অঙ্গ বা বোনম্যারো প্রতিস্থাপন করেন, তাদের জন্য এই প্রতিষেধক জীবনরক্ষাকারী হতে পারে। কারণ এসব রোগীদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রাখা হয়, আর সেই সুযোগে ভাইরাসটি ক্যান্সার তৈরি করে ফেলে।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ র্যাচেল বেন্ডার ইগনাসিও জানান, এই প্রতিষেধক ব্যবহার করলে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে আসবে।
যদিও মানুষের শরীরে পরীক্ষার জন্য এখনো কিছু ধাপ বাকি, তবু বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এটি এক বিশাল সাফল্য। সায়েন্স অ্যালার্টে প্রকাশিত এ গবেষণাটি সেল রিপোর্টস মেডিসিন সাময়িকীতে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্র: সায়েন্স এলার্ট



