চলতি বছরের জুলাইয়ে বিশ্বের সমুদ্রগুলোর পানি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ উষ্ণতার মুখে পড়েছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান সোমবার (১০ আগস্ট) জানিয়েছে, উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর ঠান্ডা অঞ্চল বাদ দিলে গত জুলাই মাসে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের উপরিভাগের গড় তাপমাত্রা ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা 'কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস' এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে জুলাইয়ের সামুদ্রিক তাপদাহ কতটা তীব্র ছিল, তা সমুদ্রের তাপমাত্রার এই নতুন রেকর্ডে স্পষ্ট। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে এবারের তাপদাহ। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার দিক থেকেও ২০২৬ সালের জুলাই মাসটি ইতিহাসের অন্যতম উত্তপ্ত মাস হিসেবে নথিভুক্ত হলো।
ইউরোপীয় সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের জলবায়ু বিজ্ঞানী সামান্থা বার্জেস বিষয়টিকে চরম জলবায়ু বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের কারণে ইউরোপের ওপর গরম বাতাস আটকে আছে। এতে মাটি শুকিয়ে গিয়ে তার স্বাভাবিক ঠান্ডা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। ফলে দিন দিন তাপমাত্রা আরো বাড়ছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণের ফলে চলতি গ্রীষ্মের শুরু থেকেই ইউরোপ একের পর এক ভয়াবহ তাপদাহের মুখোমুখি হচ্ছে। মে ও জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই শুষ্ক পরিস্থিতি জুলাইয়ে গিয়ে তীব্র খরায় রূপ নিয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের একটি বড় অংশ চরম পানিশূন্যতায় ভুগছে। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পানির অভাবে গত সপ্তাহে পোল্যান্ডে দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং হাঙ্গেরিতে তাদের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। এর ৪৪ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন দাবানলে পুরো মহাদেশজুড়ে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। 'ইউরোপীয় ফরেস্ট ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেম'-এর তথ্য বলছে, এ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর বনভূমি আগুনে ছাই হয়ে গেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তীব্র খরা ও দমকা হাওয়ার সমন্বয়ে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি আগুন নেভানোর কাজকে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে।
স্পেনের লেইডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ভিক্টর রেসকো দে দিওস সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ভয়াবহ এই 'মেগা-দাবানল' তৈরির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। আমরা যদি এখনই অভিযোজন বা প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ না নেই, তবে আজকে আমাদের কাছে যে পরিস্থিতি চরম মনে হচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তা খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই তীব্র তাপ ও খরা ইউরোপের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ধারণা, শুধুমাত্র জুন মাসের তাপদাহেই শস্যহানির কারণে ইউরোপের কৃষকদের অন্তত ২০০ কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। নতুন এক গবেষণা বলছে, খরার তাৎক্ষণিক ক্ষতির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আরো ভয়াবহ, যা কৃষির পাশাপাশি শিল্প ও নির্মাণ খাতে বছরের পর বছর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।



