নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও বিচ্ছিন্নতা : টিকে থাকার লড়াইয়ে উড়ির চরবাসী

উড়ির চরের জীবন সংগ্রাম

উড়ির চরে পৌঁছানো মানেই যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। নোয়াখালীর চর এলাহী ঘাট থেকে ট্রলার কিংবা স্পিডবোটই একমাত্র ভরসা। তাও নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই- যাত্রী না হলে নৌযান ছাড়ে না। ফলে এই যাত্রা নির্ভর করে ভাগ্য, সময় ও অপেক্ষার ওপর। এই বিচ্ছিন্নতাই উড়ির চরের মানুষের জীবনকে করে তুলেছে আরো কঠিন ও অনিশ্চিত।

Printed Edition

রফিকুল হায়দার ফরহাদ উড়ির চর (নোয়াখালী) থেকে ফিরে

উড়ির চরে পৌঁছানো মানেই যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। নোয়াখালীর চর এলাহী ঘাট থেকে ট্রলার কিংবা স্পিডবোটই একমাত্র ভরসা। তাও নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই- যাত্রী না হলে নৌযান ছাড়ে না। ফলে এই যাত্রা নির্ভর করে ভাগ্য, সময় ও অপেক্ষার ওপর। এই বিচ্ছিন্নতাই উড়ির চরের মানুষের জীবনকে করে তুলেছে আরো কঠিন ও অনিশ্চিত। উড়ির চরের সাথে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সাথে যোগাযোগের জন্য ঘাট তিনটি। একটি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চর এলাহী ঘাটে যাওয়ার চারে খাইল্লা খাট। আরেকটি সন্দ্বীপ যাওয়ার কলোনি বাজার ঘাট। অপরটি কোম্পানীগঞ্জের মুসাপুর যাওয়ার গুচ্ছ গ্রাম ঘাট। গুচ্ছগ্রাম ঘাট থেকে ট্রলারে কয়েক মিনিটেই যাওয়া যায় মুসাপুরে। চারে খাইল্লা ঘাট থেকে স্পিডবোটে যেতে সময় লাগে ১৫ মিনিটের মতো। আর কলোনিবাজার থেকে ট্রলারে সন্দ্বীপ যেতে লাগে আড়াই ঘণ্টা। চরের চার খাইল্লা ঘাট থেকে কলোনি বাজারের দুই ঘাটের মধ্যে দূরত্ব ১২ কিলোমিটারের মতো। এই সড়কই ইটের সলিং করা। বাকি রাস্তা মাটির। ফলে বর্ষায় এই মাটির রাস্তায় চলাচল করাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

চর এলাহী ঘাট বা কলোনি বাজার ঘাটে নেই কোনো জেটি বা পন্টুন। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে বোটে ওঠানামা করতে হয়। ভাটার সময় হাঁটুসমান কাদা পেরিয়ে নিচে নামতে হয়, যা শিশু, নারী ও বয়স্কদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। উড়ির চরে পৌঁছানোর পরও স্বস্তি নেই- এখানে একমাত্র চলাচলের মাধ্যম মোটরসাইকেল। বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তা কাদায় ডুবে গেলে সেটিও প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। পুরো চরে নেই কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক। চিকিৎসা বলতে চরের গ্রাম্য ডাক্তারই ভরসা। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নোয়াখালীর মাইজদীতে নিতে হয়, যা অনেক সময়সাপেক্ষ। বোট পাওয়া গেলে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা, আর না পেলে রোগীর অবস্থা নির্ভর করে ভাগ্যের ওপর। বর্ষাকালে নদীতে ঢেউ বেশি থাকলে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন রোগীদের বিনা চিকিৎসাতেই ধুকতে হয়। কারো কারো মৃত্যুও ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছরই বহু মানুষ চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান। এটি এই অঞ্চলের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা। ব্যবসায়ী কায়সারের দেয়া তথ্য, প্রতি মাসে ও প্রতি বছর এভাবে উড়ির চরের বহু মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।

শিক্ষা ব্যবস্থাও সীমাবদ্ধতায় চলছে। চরে একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি প্রাথমিক স্কুল এবং কয়েকটি মাদরাসা থাকলেও নেই কোনো কলেজ। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের নোয়াখালী বা চট্টগ্রামে যেতে হয়। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে, কেউবা মেস করে নোয়াখালী বা চট্টগ্রামে থেকে লেখাপড়া করছে। বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে এই অতিরিক্ত খরচ বহন করা সম্ভব নয়, যার ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন মাঝপথেই থেমে যায়।

জীবিকার ক্ষেত্রেও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা স্পষ্ট। উড়ির চরের মানুষের প্রধান পেশা মাছ ধরা ও কৃষিকাজ। বর্ষা মৌসুমে জমি পানিতে তলিয়ে গেলে মাছ ধরাই হয়ে ওঠে প্রধান আয়ের উৎস। তখন প্রচুর চিংড়ি ও কোরাল মাছ ধরা পড়ে এই চরে। শুষ্ক মৌসুমে চাষ হয় ধান, শসা, শিম ও খেসারি ডাল। তবে লবণাক্ততার কারণে তরমুজ চাষে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়নি। এতে কৃষকদের সম্ভাব্য আয়ের একটি বড় উৎস হারিয়ে গেছে। বাজার ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। চরের উৎপাদিত ধান যায় নোয়াখালীতে আর শসা ও শিম পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। কিন্তু দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এতে তাদের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, উড়িরচরে এক সময় অনেক উড়ি ঘাস জন্মাতো। তাই এই চরের নাম দেয়া হয়েছে উড়ির চর।

দুই বছর আগে বিদ্যুৎ সংযোগ এলেও তা এখনো উন্নয়নের বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলে বিদ্যুতের আলো জ্বললেও অবকাঠামোগত অন্ধকার কাটেনি।

সব মিলিয়ে উড়ির চরের মানুষ আধুনিকতার আংশিক ছোঁয়া পেলেও মৌলিক উন্নয়ন থেকে এখনো বঞ্চিত। নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও বিচ্ছিন্নতার সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের-যা এক গভীর উপকূলীয় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।