২০৩৫-এর মধ্যে ঢাকার যানবাহনের গতি হাঁটার চেয়ে কম হবে

দৈনিক নষ্ট হয় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা

হামিম উল কবির
Printed Edition

মেগাসিটি ঢাকার যানজটের কারণে যানবাহনের গতি কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। একটি গবেষণা বলছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকার যানবাহনের গতি পথচারীর হাঁটার গতির চেয়েও কমে যাওয়া আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ঢাকার যানবাহনের গতিবেগ ঘণ্টায় মাত্র সাত কিলোমিটার। এক দশক আগেও এই গতিবেগ ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার ছিল। বিশ্বব্যাংকের ‘স্টুয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা’ নাম প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকার যানজটের কারণে দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। অন্য দিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) তাদের গবেষণায় বলেছে, ঢাকার যানজটে দৈনিক ৮২ লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হয়। এই ৮২ লাখ কর্মঘণ্টার আর্থিক ক্ষতি দৈনিক ১৩৯ থেকে ১৪০ কোটি টাকা। বছরে ক্ষতি হয়ে থাকে (১৪০ কোটি টাকা ধরে) ৫১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

বিআইপির সভাপতি ড. আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, যেকোনো আদর্শ শহরের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা প্রয়োজন হলে ঢাকায় মেগা সিটি ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এই রাস্তার বড় অংশই আবার অবৈধ পার্কিং ও হকারদের দখলে থাকে। গণপরিবহনের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অভাব, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, যতত্র যাত্রী ওঠানামা করা এবং বাস কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতার কারণে ঢাকায় যানবাহনে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই যানজট লেগেই থাকে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন (ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ) অনুসারে, ঢাকার যানবাহনের গড়গতি ২০০৪ সালে ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। তা থেকে ২০১৫ সালে নেমে আসে সাত কিলোমিটারে। এখনই বড় ধরনের পরিকল্পণা নিয়ে পদক্ষেপ নেয়া না হলে ২০৩৫ সালের মধ্যেই যানবাহনের গতি হাঁটার গতির চেয়ে কম চার কিলোমিটারে নেমে যেতে পারে। উল্লেখ্য, ঢাকার পথচারী ঘণ্টায় চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার বেগে হাঁটতে পারে।

বিআইপির সাবেক সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, একটি সচল শহরের যানবাহনের সর্বনিম্ন গতিবেগ হতে হয় ঘণ্টায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার। ঢাকার যানবাহনের গতিবেগ নেমে এসেছে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটারে। পিকআওয়ারে যানবাহনের এই গতি নেমে আসে চার কিলোমিটারের নিচে।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনাবিদদের মতে একটি শহরের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ জায়গার রাস্তার জন্য বরাদ্দ রাখতে হয় কিন্তু আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ জুড়ে রাস্তা। উপরন্তু ঢাকার রাস্তার একটি বড় অংশ অবৈধ দখলদারদের দখলে থাকে। আবার সেই রাস্তার অনেক অংশেই গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়। অন্য দিকে মানুষের হাঁটার জন্য নির্মিত ফুটপাথ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হকারদের দখলে থাকে। হকাররা রাস্তা এমনভাবে দখল করে দোকান বসায় যেখান দিয়ে মানুষ হেঁটে যেতে পারে না। ফলে পথচারীরা রাস্তায় নেমে হাঁটতে থাকেন। এ কারণেও যানজটের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকার যানজটের ব্যাপারে বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে জনঘনত্বের ঢাকায় গণপরিবহনের চেয়ে প্রাইভেট কার বেশি। ঢাকার রাস্তার ৭০ শতাংশই দখল করে থাকে প্রাইভেট কার ও রিকশা। এখন পায়ে টানা রিকশা উঠে গিয়ে দখল করেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা (টেসলাও বলা হয়)। প্রাইভেট কার মোট যাত্রীদের মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ বহন করে। অন্য দিকে ৮০ শতাংশের বেশি গণপরিবহন নির্ভর যানবাহন মোট যাত্রীর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করতে পারে।

যানবাহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জন্য বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন করতে না পারলে এক সময় ঢাকা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যাবে।