অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচকের বড় উন্নতিতে দিন শুরু করা পুঁজিবাজারে বিক্রয়চাপের মুখে লেনদেন শেষ হলো সূচকের মিশ্র আচরণে। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চিত্র ছিল এটি। শুরুটা ভালো করেও লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে সৃষ্ট বিক্রয়চাপ সূচককে নিম্নমুখী করে তোলে। এভাবে লেনদেনের প্রায় পুরো সময় জুড়ে বাজারটি সূচকের উন্নতি ধরে রাখলেও শেষদিকে মুনাফা তুলে নিতে গেলে সৃষ্ট বিক্রয়চাপে সূচক হারায় বাজারটি। তবে এ সময় বাজারটিতে লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগের মূল্যবৃদ্ধি ঘটার পাশাপাশি উন্নতি ঘটেছে, বাজারটির লেনদেনে। ঠিক উল্টো চিত্র ছিল দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই)। এখানে সবগুলো সূচক কমবেশি উন্নতি ধরে রাখলেও বড় অবনতি ঘটে লেনদেনে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে সংশোধন হিসাবেই দেখছেন। তাদের মতে, গত সপ্তাহের সূচকের যে উন্নতি ঘটে তা বাজারের মূল্যস্তরে বেশ উন্নতি ঘটায়। তা ছাড়া দিনের শুরুতে বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ারে মূল্যবৃৃদ্ধি ঘটে দিনশেষে সেগুলোওেতই মুনাফা তুলে নিতে সক্রিয় ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। এর ফলেই সৃষ্টি হয় বিক্রয়চাপ। তারা মনে করেন, চলমান যে বাজার আচরণ তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি এবং সংশোধন অনেকটা একই সাথেই ঘটছে। পরিপক্ব বিনিয়োগকারীরা এখান থেকেই নিজেদের মুনাফা তুলে নিচ্ছেন।
ঢাকা শেয়ারবাজারে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল দিনের শুরুতে প্রায় ৪৩ পয়েন্ট উন্নতি ঘটলেও দিনশেষে ০ দশমিক ২০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। সকালে পাঁচ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি প্রথমদিকে পাঁচ হাজার ৯৩৮ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করলেও দিনশেষে স্থির হয় পাঁচ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৭৮ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৮ ও ২ দশমিক ৬২ পয়েন্ট হারায়। অন্য দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৩৩ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ১৫ হাজার ৭৬০ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি রোববার দিনশেষে পৌঁছে যায় ১৫ হাজার ৭৯৪ দশমিক ১২ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৭৭ ও ১৬ দশমিক ৪১ পয়েন্ট।
সূচকের আচরণ মিশ্র হলেও গতকাল ঢাকা স্টকে লেনদেনের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। এ দিন ডিএসই এক হাজার ২৫৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ২১৪ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহষ্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৪৩ কোটি টাকা। অন্য দিকে সূচকের উন্নতি ঘটলেও লেনদেনের বড় ধরনের অবনতি ঘটে চট্টগ্রাম স্টকে। গতকাল বাজারটি মাত্র ৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়। গত বৃহস্পতিবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৪৬ কোটি টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চলমান পুঁজিবাজার আচরণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে খুবই উপযোগী হতে পারে যদি তারা বিনিয়োগে ভালো কোম্পানিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। কারণ এখনো ভালো ও মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর মূল্যস্তর বিনিয়োগের অনুকূলে রয়েছে। বিশেষ করে জুনে অর্থবছর শেষ করা বেশ কিছু কোম্পানি যেগুলোর ভালো লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস রয়েছে এবং বরাবরই ভালো লভ্যাংশ প্রদান করে থাকে এমন কোম্পানির মূল্য-আয় অনুপাত যথেষ্ট সহনীয়। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগই ঝুঁকিমুক্ত মনে করছেন তারা।
এ দিকে পুঁজিবাজারের কার্যক্রম আরো গতিশীল, কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে প্রশাসনিক দায়িত্ব পুনর্বিন্যাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালকদের দায়িত্ব ও কার্যকরী ভূমিকা বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে নতুন এ ব্যবস্থা চালুর কথা জানানো হয়।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ২০(এ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এ আদেশে বলা হয়েছে, এখন থেকে শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ আবেদন, প্রতিবেদন, বিবরণী, চিঠিপত্র এবং অন্যান্য নিয়মিত ও অনিয়মিত নথি সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান অর্থাৎ নির্বাহী পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাখিল করতে হবে। শেয়ারবাজারের উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থসংরক্ষণ এবং বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বিষয় দ্রুত, দক্ষ, সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এর আগে কোনো আত্মনিয়ামক সংস্থা, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটির ইস্যুয়ার, অন্যান্য সিকিউরিটির ইস্যুয়ার, নিবন্ধিত বাজার মধ্যস্থতাকারী এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে দাখিল করা আবেদন, প্রতিবেদন বা চিঠিপত্র প্রথমে কমিশনের চেয়ারম্যান অথবা কোনো কমিশনারের দফতরে জমা দেয়া হতো। পরে তা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে পাঠানো হতো। এ কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়ার কারণে নথিপত্র গ্রহণ, স্থানান্তর এবং পরবর্তী কার্যক্রমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হতো। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই প্রশাসনিক ধাপ কমিয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী পরিচালকের কাছে সরাসরি নথি দাখিলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ দ্রুত বিষয়গুলো যাচাই, পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে বিএসইসির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে গতি আসবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। একই সাথে শেয়ারবাজারের অংশীজনদের সাথে কমিশনের যোগাযোগ ও সেবা কার্যক্রম আরো কার্যকর হবে।
তবে সব ধরনের আবেদন বা নথি নির্বাহী পরিচালকের মাধ্যমে জমা দেয়া যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পাঁচ ধরনের বিষয় সরাসরি কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করতে হবে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে যেকোনো অভিযোগ, তথ্য প্রকাশকারীর দেয়া তথ্য, ঘোষণা বা অভিযোগ, কমিশনের নির্দেশে পরিচালিত অনুসন্ধান বা তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা অন্য কোনো বিশেষ প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং কমিশন কর্তৃক বিশেষভাবে নির্ধারিত অন্যান্য বিষয়।
এ ছাড়া কমিশনের নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে জমা দেয়ার উপযোগী আবেদন, প্রতিবেদন বা অভিযোগ অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই দাখিল করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিভাগীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ নিজ বিভাগের বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারবেন। এতে শেয়ারবাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা আরো শক্তিশালী হবে।



