বিশেষ সংবাদদাতা
জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেয়া হবে, যাতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সঙ্কট : সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ভারতের মতো বাংলাদেশেও সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যাতে জ্বালানি তেলের ব্যবসা করতে পারে, সে জন্য একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, সবাই যাতে ব্যবসা করতে পারে, সে লক্ষ্যেই এই নীতি তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতকে কেন্দ্র করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল এবং পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন ও কালোবাজারি দেখা দিয়েছিল। এ প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছে। একাধিক আমদানিকারক থাকলে সঙ্কটকালে একক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমবে বলে মনে করেন তিনি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন ও মূল্য নির্ধারণে সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ জ্বালানি তেল একটি কৌশলগত পণ্য।
সেমিনারে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাসের ঘাটতির কারণে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চালু করতে ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগলেও সরকার দুই বছরের কম সময়ে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউর পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার জন্য জমি চিহ্নিত ও পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এলপিজির বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাল্ক এলপিজি আমদানির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, নভেম্বরে অফশোর বিডিং রাউন্ড শেষ হবে এবং অনশোর বিডিং রাউন্ড নিয়েও কাজ চলছে।
মূল প্রবন্ধে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবেলায় এলএনজি আমদানি প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। জ্বালানি সঙ্কটের পাশাপাশি ডলার সঙ্কটও একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করে তিনি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন অন্তত দুই হাজার এমএমসিএফডির কাছাকাছি ধরে রাখার পরামর্শ দেন। তার হিসাবে, ২০৩০ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা দাঁড়াতে পারে প্রায় চার হাজার ৬০০ এমএমসিএফডিতে।
প্যানেল আলোচনায় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভিসি অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, জ্বালানি সঙ্কটের কোনো একক সমাধান নেই; গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সংযোজন ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির সহায়তায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জরুরি। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের অভাবকে খাতের বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ সব উৎস কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন এবং মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক জ্বালানি হাব হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা বলেন। বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত গ্যাসের ঘাটতিতে ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য পুনর্ব্যক্ত করে দ্রুত এফএসআরইউ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এফইআরবির চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ।



