দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মূল ভিত্তি একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন ‘কমিশন’, কিন্তু সেটি গঠন করা যায়নি গত পাঁচ মাসেও। ফলে অভিভাবকহীন এ সংস্থা উল্লেখযোগ্য কোনো কাজে আসছে না। দীর্ঘ সময় ধরে কমিশনশূন্য থাকায় দুদকের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৩ মার্চ দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করে। এর পর থেকে নতুন কমিশন আর গঠন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি এখন অভিভাবকশূন্য।
জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থার শূন্যতা কাটছে কবে? তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুদক কমিশন গঠনের জন্য সরকারের গঠিত সার্চ কমিটি কাজ করছে। চলতি মাসের মধ্যে দুদকের নতুন চেয়ারম্যানসহ কমিশন গঠন হতে পারে।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পাঁচ বছরের মেয়াদে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। তার সাথে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ১১ ডিসেম্বর এবং হাফিজ আহসান ফরিদ ১৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মোমেন কমিশন নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন তারা।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, গত পাঁচ মাস ধরে কমিশনশূন্য থাকায় কাজে স্থবিরতা নেমে এসেছে। এই সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে, যেগুলোর কোনো প্রতিকার মিলছে না। দিন দিন অভিযোগের স্তূপ আরো বেড়েই চলেছে। একই সাথে আসামি গ্রেফতার, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, অপরাধ সংশ্লিষ্ট সম্পদ জব্দ কিংবা অপরাধীর বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা প্রদান, সবই কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ সময় কমিশনশূন্য থাকার ঘটনা এবারই প্রথম। যদিও এর আগেও দুদকের শুরুর দিকে ভিন্ন ভিন্ন কারণে প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। সেগুলো বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
কমিশন গঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে দুদকের নবনিযুক্ত সচিব মো: সাইদুর রহমান খান বলেন, সার্চ কমিটি মিটিং করে প্রায় ফাইনাল করে ফেলেছেন। এখন সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রসিডিউর আছে, সেটা মেইনটেইন করে যতটুকু জানি শিগগিরই কমিশন গঠন হবে। তিনি আরো বলেন, যে সার্চ কমিটি কাজ করছে, সেখানে দুদকের কোনো প্রতিনিধি নেই। সুতরাং আমরা ভেতরের খবর জানি না, জানার কথাও না। এটুকু বলতে পারি প্রসিডিউর ফাইনাল স্টেজে আছে। আমরা খুব দ্রুত এটার ফলাফল পাব।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, দুদকের কমিশন গঠনের জন্য গঠিত সার্চ কমিটির কার্যক্রম প্রায় শেষের দিকে। গত ২২ জুন দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো: রেজাউল হককে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠিত হওয়ার পর আবেদন আহ্বান করা হয়।
জানা গেছে, অর্ধশতাধিক বায়োডাটা জমা নেয়া হয়। ইতোমধ্যে বায়োডাটা জমা দেয়া প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন হয়েছে। সার্চ কমিটি সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে। যেখানে সাবেক আমলা, সাবেক সেনাকর্মকর্তা, আইনজীবী ও বিচার বিভাগের বেশকিছু নাম আলোচনায় রয়েছে।
আরেকটি সূত্র বলছে, সার্চ কমিটির কার্যক্রম শেষের দিকে হলেও কমিশন গঠন বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর দুদক কমিশন গঠন হতে পারে।
দুদকের ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা জটিলতায় তিনটি কমিশন পুরো মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিল। বাকি চার কমিশন মেয়াদ পূর্ণ করার আগে বিদায় নিতে হয়। সর্বশেষ মোমেন কমিশন মেয়াদ পূরণ না করেই বিদায় নিয়েছে।
সর্বশেষ কমিশনের কর্মকর্তাদের পদত্যাগের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও দুদকে কমিশন গঠন না হওয়াকে অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক ঘটনা বলে মনে করছেন দুদকের এক সাবেক মহাপরিচালক। তিনি বলেন, দুদকের মতো একমাত্র ক্ষমতাবান ও এখতিয়ারসম্পন্ন একটা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ মাস ধরে অচল করে রাখা হয়েছে। নিয়ম হচ্ছে, আগের কমিশন পদত্যাগের পর ৩০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণ করতে হবে, যা সরকারের দায়িত্ব। সরকার এমন উদ্যোগ নিতে দেরি করছে। বাছাই কমিটির কার্যক্রমও ৩০ দিনের বেশি হয়ে গেছে।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশন না থাকার ফলে দুর্নীতি দমনের সব কাজই বন্ধ। কমিশন ছাড়া সিদ্ধান্ত হবে না। আগের সিদ্ধান্তগুলোর আলোকে অনুসন্ধান বা তদন্তকাজ চলছে। তবে যেহেতু কমিশন নাই সেজন্য ঢিলেঢালা কাজ হচ্ছে। কর্মকর্তারা প্রতিবেদন তৈরি করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেউ নাই। সব দিক থেকে দুর্নীতি দমনের কাজ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঘুষ গ্রহণের ফাঁদ মামলার কার্যক্রম বন্ধ, আসামি গ্রেফতার হচ্ছে না। নতুন অনুসন্ধানের কাজ হচ্ছে না।
কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় আলোচনায় যারা : নতুন কমিশনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে গত পাঁচ মাস ধরে সাবেক আমলা, বিচারপতি কিংবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে। যদিও সার্চ কমিটির সুপারিশের আলোকে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সার্চ কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দু’টি নাম সুপারিশ করবে।
দুদকসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেনের নাম। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুসারে এখনো আলোচনার প্রথম সারিতে তিনি আছেন। এ ছাড়া সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান, সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার ও সাবেক জেলা জজ রুহুল কুদ্দুসের নামও আলোচিত হচ্ছে জোরেশোরে।
এর মধ্যে সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন ঢাকা মহানগর আদালতে সিনিয়র স্পেশাল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ আদালতের বিচারক হিসেবে তিনি দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন।
অন্য দিকে সাবেক আমলাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক মুখ্যসচিব এ এস এম আব্দুল হালিম, সাবেক সচিব আবদুল বাকি (বাকী বিল্লাহ), সাবেক সচিব আবু বকর মো: শাহজাহান, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব আবদুস সাত্তারের নামও আলোচিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া আলোচনায় আছেন সাবেক সচিব আবদুস সবুর ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো: সাজ্জাদ হোসেন।
সেনাবাহিনীর প্রধান ও ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে আলোচনায়। এ ছাড়া দুদকের সাবেক কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (প্রশাসন) মুনীর চৌধুরীর নামও আলোচনায় রয়েছে।
দুদক আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭ অনুযায়ী কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য গত ২২ জুন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। আপিল বিভাগের বিচারপতি মো: রেজাউল হককে সার্চ কমিটির সভাপতি করা হয়। সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটি দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ন্যূনতম দুইজন করে প্রার্থীর নামের তালিকা প্রস্তুত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। পরে রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেবেন।
সার্চ কমিটির কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। গত ২ জুলাই থেকে আবেদন জমা নেয়া হয় এবং জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল ১৩ জুলাই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সার্চ কমিটি প্রার্থীদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি দমনের বিষয়ে অবস্থান, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং জনস্বার্থে কাজের রেকর্ডসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করছে। দুদক আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী সার্চ কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। যার মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।



