সাক্ষাৎকার : ড. রাশেদ চৌধুরী

এল নিনো মানেই খরা নয় এর ধরন বোঝা জরুরি

বাংলাদেশে এল নিনোর কথা শোনা গেলেই বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, এবার বুঝি তীব্র তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির ঘাটতি অথবা খরা দেখা দেবে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন ধরনের। পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং এল নিনোর প্রভাবও সব সময় একই রকমভাবে পড়ে না। বরং এল নিনোর ধরন, তীব্রতা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক জলবায়ুগত উপাদানের সাথে এর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়াগত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, যদি এল নিনো মৌসুমি বৃষ্টিপাতকে দুর্বল করে তাহলে বাংলাদেশে কেন কখনো কখনো এল নিনোর বছরেই অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণ দেখা যায়। এর উত্তর লুকিয়ে আছে এল নিনোর ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির মধ্যে।

Printed Edition

বাংলাদেশে এল নিনোর কথা শোনা গেলেই বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, এবার বুঝি তীব্র তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির ঘাটতি অথবা খরা দেখা দেবে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন ধরনের। পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং এল নিনোর প্রভাবও সব সময় একই রকমভাবে পড়ে না। বরং এল নিনোর ধরন, তীব্রতা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক জলবায়ুগত উপাদানের সাথে এর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়াগত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, যদি এল নিনো মৌসুমি বৃষ্টিপাতকে দুর্বল করে তাহলে বাংলাদেশে কেন কখনো কখনো এল নিনোর বছরেই অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণ দেখা যায়। এর উত্তর লুকিয়ে আছে এল নিনোর ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির মধ্যে। এই এল নিনো নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং অ্যারিজোনা স্ট্যাট ইউনিভার্সিটির এডজাঙ্কট প্রফেসর ড. রাশেদ চৌধুরী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নয়া দিগন্তের বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির।

নয়া দিগন্ত : এল নিনো কী?

ড. রাশেদ চৌধুরী : এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসগারের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুজনিত ঘটনা। এটি বৃহত্তর এল নিনো- সাউদার্ন অসিলেমন (ইএনএসও) ব্যবস্থার একটি অংশ। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এই এল নিনো দেখা দেয় এবং এটি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলেল বৃষ্টিপাত, ঝড় এবং মৌসুমি বায়ুর গতি প্রকৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়াটাও এই বৈশি^ক জলবায়ু ব্যবস্থার বাইরে নয়। তবে এল নিনোর প্রভাব সব বছর একই রকমের হয় না। বিজ্ঞানীরা সাধারণভাবে এল নিলোকে দুই প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকেন। প্রথমটি হলো- ইস্টার্ন প্যাসিফিক এল নিনো। এ ধরনের ঘটনায় প্রশান্ত মহাসগারের পূর্বাংশে বিশেষ করে আমেরিকার উপকূল সংলগ্ন এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেশি বেশি বেড়ে থাকে। দ্বিতীয়টি হলো- সেন্ট্রাল প্যাসিফিক এল নিনো, এটা এল নিনো মোডোকি নামেও পরিচিত। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উষ্ণতা সৃষ্টি হয় প্রশান্ত মহাসগারের মধ্যাঞ্চলে, পূর্বাংশে নয়। দু’টি ঘটনাই এল নিনোর অন্তর্ভুক্ত হলে উষ্ণতার অবস্থার পরিবর্তিত হওয়ায় বায়ুমণ্ডলের চলাচল, মেঘের সৃষ্টি ও বৃষ্টিপাতের ধরনও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবতর্তিত হয়।

নয়া দিগন্ত : কেন অবস্থানের পার্থক্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

ড. রাশেদ চৌধুরী : সমুদ্র পৃষ্ঠের উষ্ণতা যেখানে বেশি থাকে, সেখানে বাষ্পীভবনও বেশি হয়। এর ফলে সেই অঞ্চলে শক্তিশালী মেঘের সৃষ্টি হয় এবং বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ে। জলবায়ুবিদরা এই প্রক্রিয়াকে ট্রপিকেল কনভেকশন বলে থাকে। যখন উষ্ণতার কেন্দ্র পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থান করে, তখন বায়ু মণ্ডলের বৈশি^ক চলাচল একভাবে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। কিন্তু উষ্ণতার কেন্দ্র যদি মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে সরে আসে, তাহলে সেই পরিবর্তনের ধরনও ভিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে এশিয়ার মৌসুমি বায়ু, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, এমনকি বঙ্গোপসাগরে আর্দ্রতার প্রবাহও পরিবর্তিত হতে পারে। যখন উষ্ণতার কেন্দ্র প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থান করে, তখন বায়ু মণ্ডলের বৈশি^ক চলাচল এককভাবে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু উষ্ণতার কেন্দ্র যদি মধ্য প্রশান্ত মহাসগরে সরে আসে, তখন সেই পরিবর্তনের ধরনও ভিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে এশিয়ার মৌসুমি বায়ু, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, এমনকি বঙ্গোপসাগরে আর্দ্রতার প্রবাহও পরিবর্তিত হতে পারে। এ কারণেই এক ধরনের এল নিনো বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমিয়ে দিতে পারে, আবার অন্য ধরনের এল নিনো বৃষ্টিপাত বাড়িয়ে দিতে পারে বাংলাদেশে। আবার একই ধরনের এল নিনো একই সময়ে বাংলাদেশে ভারী বর্ষণের পরিবেশও সৃষ্টি করতে পারে।

নয়া দিগন্ত : এর আগে ১৯৯৭-৯৮ ও ২০১৫-১৬ সালেও এল নিনোর ঘটনা ঘটে। সেই সময়ের যে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল, সেটা কিভাবে আপনি বর্ণনা করবেন?

ড. রাশেদ চৌধুরী : ১৯৯৭-৯৮ সালে যে এল নিনোর ঘটনার ঘটেছিল সেটা ছিল বিশে^র অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো। সেটা ছিল ইস্টার্ন প্যাসিফিক এল নিনো। সে সময় পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল এবং বিশ^জুড়ে আবহাওয়ার এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তখন বৃষ্টিপাত কমে যায় বাংলাদেশে, সে সময়টায় খরার ঘটনা ঘটে। অন্য দিকে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনো অনেকটাই সেন্ট্রাল প্যাসিফিক এল নিনোর বৈশিষ্ট্য বহন করেছিল। এ সময় বাংলাদেশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যা হয়। এতে উষ্ণতার কেন্দ্র তুলনামূলকভাবে পশ্চিমে অবস্থান করায় বায়ুমণ্ডলের চলাচল ভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ধরনও ১৯৯৭ সালের তুলনায় ভিন্ন ছিল। এই দুইটি ঘটনার এই দুইটি ঘটনার তুলনা থেকেই স্পষ্ট হয় যে, শুধু এল নিনো হয়েছে এই তথ্য দিয়ে কোনো দেশের আবহাওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেয়া যায়। কোনো ধরনের এল নিনো সক্রিয় রয়েছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নয়া দিগন্ত : তাহলে বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টিপাত কেন হয়ে থাকে, কিসের প্রভাবে?

ড. রাশেদ চৌধুরী : বাংলাদেশের বর্ষাকাল শুধু এল নিনোর ওপর নির্ভর করে না। এর সাথে আরো অনেক উপাদান কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা, ভারত মহাসগারের ডাইপোল (ইন্ডিয়ান ওশেন ডাইপোল), মৌসুমী বায়ুর শক্তি, নি¤œচাপ ও লঘুচাপের সৃষ্টি, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অন্যতম। কখনো কখনো এল নিনো সক্রিয় থাকলেও বঙ্গোপসাগরে প্রচুর জলীয় বাষ্প জমা হয়, একটার পর একটা নি¤œচাপ সৃষ্টি হয় এবং মৌসুমী বায়ু শক্তিশালী অবস্থায় থাকে। তখন বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ঘটনাও একাধিকবার দেখা গেছে। অর্থাৎ এল নিনো থাকলেই যে খরা হবে এমন ধারনা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।

নয়া দিগন্ত : তাহলে কি ক্লাইমেট বা জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা সম্বন্ধে ধারণা থাকতে হবে আবহাওয়ার বিষয়ে পূর্বাভাস দেয়ার আগে?

ড. রাশেদ চৌধুরী : হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি তাই বলি, জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা সম্বন্ধে আগে ভালোভাবে জানতে হবে। বর্তমানে বৈশি^ক উষ্ণায়নের কারণে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। এর ফলে বৃষ্টি হলে তা অনেক সময় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তীব্র আকারে বৃষ্টি নেমে আসে। তাই একই বছরে কোথাও খরা, আবার কোথাও অতি বৃষ্টি দেখা দেয়া এখন অস্বাভাবিক কিছু নয়। গবেষকরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এল নিনো এবং অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক আরো জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু এল নিনোর উপস্থিতি নয়, এর ধরন, তীব্রতা এবং অন্যান্য জলবায়ুজনিত সূচকের সমন্বিত বিশ্লেষণই সঠিক পূর্বাভাস দেয়ার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

নয়া দিগন্ত : তাহলে এল নিনো সম্বন্ধে ভুল ধারণা রয়েছে অনেকের কাছে?

ড. রাশেদ চৌধুরী : হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি। এখন ভুল ভাঙ্গার সময়ে এসেছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু সংবেদনশীল দেশে আবহাওয়া নিয়ে ভুলনা ধারণা নীতিনির্ধারণ, কৃষি পরিকল্পনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এল নিনোকে একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা না করে এর প্রকৃতি, অবস্থান এবং অন্যান্য বৈশি^ক জলবায়ুজনিত প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্ক হিসেবে বুঝতে হবে। সব এল নিনো এক নয়। কোথায় সমুদ্রের উষ্ণতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে, সেটিই নির্ধারণ করে বায়ুমণ্ডল কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশে কিভাবে পৌঁছবে এর ওপর। সুতরাং এল নিনো মানেই বাংলাদেশে খরা হবে, এমন ধারণা বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি মিলে না। বরং কোন ধরনের এল নিনো সক্রিয় রয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য আবহাওয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব। জলবায়ু বিজ্ঞানের এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বোঝা ভবিষ্যতের পূর্বাভাস, কৃষি পরিকল্পনা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।