জেআইসিতে গুম ও নির্যাতন

বিমানের শব্দে নিশ্চিত হই আমি ডিজিএফআইর অধীনে আছি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

সময়টা ছিল ২০১৬ সালের এক তপ্ত সকাল। সাধারণ এক কর্মব্যস্ত দিন যেভাবে শুরু হয়, নাজিম উদ্দিনের দিনটিও ঠিক সেভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু কে জানত, মিরপুরের সেই জনাকীর্ণ সড়ক থেকে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তিনি হারিয়ে যাবেন এক অন্ধকার গোলকধাঁধায় যেখানে দিন আর রাতের পার্থক্য ঘুচে যায়, যেখানে মানুষের আর্তনাদ দেয়ালে খোদাই করা থাকে। আট বছর পর, সেই বিভীষিকাময় স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।

গতকাল সোমবার যখন তিনি জবানবন্দী দিচ্ছিলেন, তখন আদালতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বারবার ঝরছিল এক বিচারপ্রার্থী মানুষের চোখের পানি। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে নাজিম উদ্দিন বর্ণনা করেন তার গুম হওয়ার সেই ৯৪২ দিন এবং ডিজিএফআইর কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’ থেকে র‌্যাবের টর্চার সেল পর্যন্ত বিস্তৃত এক নারকীয় অধ্যায়। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বেঞ্চের সামনে তিনি তুলে ধরেন, কিভাবে একটি স্বাধীন দেশে কেবল ভিন্ন মতের কলম ধরার অপরাধে একজন মানুষকে জীবন্ত কবরের স্বাদ নিতে হয়। অন্য সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

জেআইসিতে গুম করে রাখার এই মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে তিনজন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাদের সোমবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

মামলার অন্য ১০ আসামি পলাতক। পলাতক আসামিদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক। পলাতক আসামিদের মধ্যে আরো আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক। এ ছাড়া পলাতক আছেন আসামি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

নাজিম উদ্দিন জানান, তার বয়স ৪৮ বছর। তার বাড়ি যশোরের মনিরামপুর। তিনি একজন কম্পিউটার ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি মনিরামপুর পৌরসভা যুবদলের দফতর সম্পাদক এবং পরে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দফতর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি একটি প্রজেক্টের অধীনে দুই বছরের জন্য মালয়েশিয়া যান এবং ২০১৫ সালের আগস্টে দেশে ফিরে পুনরায় সরাসরি রাজনীতি ও ব্যবসায় মনোযোগ দেন। তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিপক্ষে ফেসবুকে লেখালেখি করার কারণে তিনি অনেকের শত্রু হয়ে যান। নিরাপত্তাহীনতা বোধ করায় তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং মিরপুর ডিওএইচএস’র ভেতরে একটি অফিস ভাড়া নেন।

তিনি জানান, ২৫ মে ২০১৬ সাল ছিল তার জীবনের শেষ স্বাভাবিক দিন। বেলা ১১টা নাগাদ মিরপুর-১২ এর মোল্লা টাওয়ারের সামনে থেকে যখন তাকে কালো হাইস মাইক্রোবাসে তোলা হয়, তখন তিনি জানতেন না সামনের দিনগুলোতে সূর্যরশ্মি দেখা তার জন্য বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াবে। ‘আমাদের সাথে গেলে আমাদের পরিচয় জানতে পারবে’ অপহরণকারীদের এই একটি বাক্যই ছিল তার পরবর্তী কয়েক বছরের বন্দিজীবনের ভূমিকা।

গুমের প্রথম কয়েক দিন ঘোরের মধ্যে কাটার পর যখন নাজিম উদ্দিনের হুঁশ ফেরে, তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন ৮ ফুট বাই ১১ ফুটের এক সঙ্কীর্ণ প্রকোষ্ঠে। সেখানে কোনো জানালা ছিল না, ছিল না বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম। কিন্তু সেই সেলের দেয়ালগুলো ছিল কথা বলা জীবন্ত দলিল। নাজিম বলেন, দেয়ালের পরতে পরতে লেখা ছিল শত শত বন্দীর নাম, মোবাইল নম্বর আর অসহ্য যন্ত্রণার আর্তনাদ। সেখানেই একটি লেখায় চোখ আটকে যায় আমার ‘এটি ডিজিএফআই’র হেডকোয়ার্টার জেআইসি সেল’। বনানীতে চাকরির সুবাদে আগে থেকেই এলাকাটি আমার চেনা ছিল। কক্ষের ভেতর থেকে শোনা যাওয়া বিমানের গর্জন আর পাশের মসজিদের নামাজে জানাজার ঘোষণা শুনে আমি নিশ্চিত হই, আমি কোনো সাধারণ বন্দিশালায় নই, আমি আয়নাঘরের জঠরে বন্দী।’

আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করার ‘অপরাধে’ তার ওপর চালানো হতো মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। লাঠির আঘাত আর মানসিক নিপীড়ন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এমনকি নিজের জীবনী লেখার জন্য তাকে সময় বেঁধে দেয়া হতো। গভীর রাতে যখন তাকে হাতকড়া পরিয়ে যমের দুয়ারে নেয়ার হুমকি দেয়া হতো, তখন তিনি কেবল মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনতেন। তাকে বলা হয়েছিল, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দেবো।’

ডিজিএফআই থেকে র‌্যাব-২, র‌্যাব-১০ হয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের র‌্যাব-৭-এ। দীর্ঘ কয়েক মাস গুম রাখার পর নাটক সাজানো হয় অস্ত্র উদ্ধারের। কর্নেল হাটে সাজানো নাটকের পর তাকে সাংবাদিক ও ক্যামেরা লেন্সের সামনে দাঁড় করানো হয় মাথায় হেলমেট পরিয়ে, মুখে প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নিয়ে। ১৮ মাস জেল খাটার পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পেলেও নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থাকতে হয়েছিল তাকে। আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রশাসনের অব্যাহত চাপে বাধ্য হয়েছিলেন প্রবাসে পাড়ি জমাতে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ দেশে ফিরে তিনি আজ বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্থ।

জবানবন্দী শেষ করে যখন নাজিম উদ্দিন ডুকরে কেঁদে ওঠেন, তখন আদালতের গুমোট পরিবেশে ফুটে ওঠে এক দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ আর ন্যায়বিচারের আকুতি। তিনি বলেন, ‘আমি কেবল আমার হারানো দিনগুলো ফিরে পেতে চাই না, আমি চাই আমার ওপর হওয়া এই অবিচারের শেষ দেখে যেতে।’