নয়া দিগন্ত ডেস্ক
চলমান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাবকে ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, অস্বাভাবিক এবং অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, তেহরান চাপের মুখে কোনোভাবেই নতি স্বীকার করবে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
ইসমাইল বাঘেই জানান, কয়েক দিন আগে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই ১৫ দফার পরিকল্পনা পেশ করেছে। পাকিস্তান এবং আরো কিছু বন্ধু দেশের মাধ্যমে এই প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছানো হয়। তবে ইরান এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে দিয়ে নিজেদের একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব স্বার্থ এবং বিবেচনার ভিত্তিতে আমরা আমাদের দাবির একটি সেট চূড়ান্ত করেছি। তবে সঠিক সময়েই কেবল সেগুলো প্রকাশ করা হবে।’
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করাকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখতে নারাজ তেহরান। বাঘেই বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কোনো পরিকল্পনার জবাবে খুব দ্রুত এবং সাহসের সাথে নিজের মতামত তুলে ধরছে- একে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ মনে করা ঠিক হবে না। যখনই প্রয়োজন হবে, আমরা আপনাদের স্পষ্টভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবো।’
এ দিকে তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু কয়েকটি পাকিস্তানি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলছে, আলোচনায় বসার আগে ইরান কিছু শর্ত দিয়েছে। তেহরান চায় হরমুজ প্রণালী নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা কোনো শর্ত ছাড়াই প্রত্যাহার করতে হবে। তাদের জোর করে সংলাপে বসানো যাবে না। আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে অবশ্যই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য, এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না করলে ইরানের ওপর ‘নরক’ নামিয়ে আনা হবে।
ইউরেনিয়াম চুরি করতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র : বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধারের নামে মার্কিন বাহিনী মূলত ইরানের ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ চুরির চেষ্টা চালিয়েছিল বলে দাবি করেছে তেহরান। গতকাল সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই কথিত ‘সাহসী’ উদ্ধার অভিযান ছিল মূলত একটি প্রতারণা বা ‘কভার অপারেশন’।
মিডল ইস্ট আই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই-এর বরাত দিয়ে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পুরো অভিযান নিয়ে ‘অনেক প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা’ রয়েছে। পাইলটের অবস্থান এবং মার্কিন বাহিনীর অবতরণস্থলের মধ্যকার বিশাল দূরত্বের বিষয়টি সামনে আনেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন।
বাঘেই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, তাদের নিখোঁজ ক্রু কোহগিলুয়েহ ও বয়র-আহমদ এবং খুজেস্তান প্রদেশের আশপাশে থাকতে পারে। কিন্তু ওই এলাকাটি মধ্য-ইরানের সেই এলাকা থেকে অনেক দূরে, যেখানে মার্কিন বাহিনী তাদের সৈন্য নামানোর চেষ্টা করেছিল। পাইলট উদ্ধারের নাম করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম চুরির উদ্দেশ্যে এই ‘প্রতারণামূলক অভিযান’ চালানোর সম্ভাবনা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।
ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই অভিযানকে একটি ‘ব্যর্থ প্রতারণা ও পালানোর মিশন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, মার্কিন বাহিনী এই অভিযানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে এবং তাদের বেশ কিছু বিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে। মুখপাত্র বাঘেই এই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এর আগে রোববার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, গত শুক্রবার বিধ্বস্ত হওয়া এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে এক ‘দুঃসাহসিক’ অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি জানান, ওই পাইলট বর্তমানে নিরাপদ আছেন। তিনি আরও জানান, নিখোঁজ ওই ক্রু সদস্য (একজন কর্নেল) ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, ওই কর্মকর্তা ‘শত্রুপক্ষের পেছনে, ইরানের বিপজ্জনক পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন এবং শত্রুরা প্রায় তার কাছাকাছি চলে আসছিল।’
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, তিনি ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় একা পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন। তার কাছে একটি হ্যান্ডগান ছিল। তিনি পাহাড়ের একটি ফাঁকে আশ্রয় নেন এবং প্রায় সাত হাজার ফুট (দুই হাজার মিটার) উচ্চতার একটি রিজ লাইনে (শৈলরেখা) ওঠেন। তার অবস্থান ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। উদ্ধার শেষে তাকে চিকিৎসার জন্য কুয়েতে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্ধার অভিযানে সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা ক্রু সদস্যের অবস্থান শনাক্ত করে সে তথ্য পেন্টাগনের কাছে সরবরাহ করে।
একই সাথে ইরানের ভেতরে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর একটি কৌশলও গ্রহণ করা হয়। উদ্ধার অভিযান চলাকালে প্রচার করা হয় যে, ওই ক্রু সদস্যকে এরইমধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে এবং তাকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করেন, এই অভিযানে কয়েক ডজন বিমান ব্যবহার করা হলেও কোনো মার্কিন সদস্য নিহত বা আহত হননি।
কুদস ফোর্সের ইউনিটপ্রধানকে হত্যার দাবি ইসরাইলের : ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের গোপন বা আন্ডারকাভার ইউনিটের প্রধানকে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ)। গতকাল সোমবার ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেয়া হয়। আইডিএফের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেন, কুদস ফোর্সের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা আসগর বাকেরিকে হত্যা করা হয়েছে। শোশানি জানান, নিহত বাকেরি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ ছাড়া ইসরাইল, সিরিয়া ও লেবাননে কুদস ফোর্সের বিভিন্ন গোপন সামরিক অভিযান পরিচালনার পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে এ বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
হাইফায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : নিহত ৪
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের হাইফায় একটি ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলি উদ্ধারকারী সংস্থার কর্মীরা ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করেছে। টাইমস অব ইসরাইলের এক খবরে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হাইফায় আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একই এলাকায় নতুন করে চালানো আরেক হামলায় আরো চারজন সামান্য আহত হয়েছেন এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সোমবার ভোরের দিকে ইসরাইলের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী সংস্থা বলেছে, হোম ফ্রন্ট কমান্ডের সাথে কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া দু’জনকে উদ্ধার করেছেন। যাদের শরীরে প্রাণের কোনও স্পন্দন পাওয়া যায়নি। নিহত ওই দু’জন ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বলেছে, ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে তৃতীয় আরেকজনের লাশ পাওয়া গেছে। ওই লাশ ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির। এর কিছুক্ষণ পর উদ্ধারকারী দল ৩৫ বছর বয়সী এক নারীর লাশ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানার প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর শেষ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত রোববার গভীর রাতে প্রাথমিকভাবে ইসরাইলের উদ্ধারকারীরা বলেছিলেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর থেকে ভবনের চারজন নিখোঁজ রয়েছেন এবং ভবনটি ধসে পড়ার ‘গুরুতর’ ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ইসরাইলের চিকিৎসা কর্মকর্তারা বলেছেন, এই হামলায় ৮২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৭৮ ও ৩৮ বছর বয়সী দুই নারী এবং ১০ মাস বয়সী এক শিশু সামান্য আহত হয়েছে। শিশুটি মাথায় আঘাত পেয়েছে। সোমবার ইসরাইলের রামবাম হেলথ কেয়ার ক্যাম্পাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ৮২ বছর বয়সী ওই বৃদ্ধের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং তাকে বর্তমানে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। তার ৭৮ বছর বয়সী স্ত্রীও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং বর্তমানে ভালো আছেন।



