আলজাজিরা
ইরানের রাজধানী তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে যে সঙ্ঘাতের সূচনা হয়েছিল, তার ছয় মাস পূর্ণ হলেও দৃশ্যত কোনো পক্ষই তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। উক্ত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার ঘটনাকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামরিক কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও, দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক জটিল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মুখোমুখি।
সামরিক অভিযানের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি বিনাশ করার যে দাবি করেছিলেন, বর্তমান বাস্তবতায় তা প্রশ্নবিদ্ধ। উল্টো ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অর্ধেকেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির জন্য তীব্র রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। জরিপ সংস্থা ইপসোসের তথ্যানুযায়ী, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক এই সামরিক অভিযানকে সমর্থন করছেন। মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় শুরু হওয়া এই যুদ্ধের আর্থিক বোঝা এখন সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। অন্য দিকে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতানিয়াহুর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশটির নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানোর যে লক্ষ্য নিয়ে ইসরাইল এই যুদ্ধ জোরদার করেছিল, তা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে তীব্র সমালোচনার জন্ম হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় ইরান এখনো ইসরাইলের জন্য আগের মতোই বড় হুমকি হিসেবেই রয়ে গেছে। উপরন্তু, গত জুনে ইসরাইলকে বাদ দিয়েই ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ঘটনাটি নেতানিয়াহুকে আরো ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।
প্রচণ্ড সামরিক চাপ ও নতুন আরোপিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ জাতীয় কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এখনো দৃশ্যমানভাবে টিকে রয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ ও মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িক বাধাগ্রস্ত হলেও এবং এ পর্যন্ত অন্তত ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতি ও ৬৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি তৈরি হলেও দেশটি চরম টিকে থাকার সামর্থ্য প্রদর্শন করছে। তবে অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েন তেহরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে নতুন দ্বন্দ্বের উন্মেষ ঘটিয়েছে।



